জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির চাপ-এই কয়েকটি কারণে দেশে মার্কিন ডলারের চাহিদা বেড়েছে। এর প্রভাবে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের দর বেড়ে প্রায় ১২৪ টাকায় পৌঁছেছে। ব্যাংকগুলোও এর চেয়ে বেশি দরে ডলার বিক্রি করছে। অন্যদিকে, খোলা বাজারে ডলারের বিক্রয়মূল্য উঠেছে ১২৮ টাকা ২০ পয়সায়।
গতকাল বুধবারের (২৮ অক্টোবর) বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী, আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের গড় দর ছিল ১২৩ টাকা ৯৮ পয়সা। এক সপ্তাহ আগে ১৯ অক্টোবর এ দর ছিল ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা। আর ১ অক্টোবর ছিল ১২৩ টাকা ৩ পয়সা। সে হিসাবে এক সপ্তাহে ডলারের দর বেড়েছে শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ এবং এক মাসে বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বুধবার রাতে বলেন, জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলারে উঠেছে। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের দামও বেশি। এর সঙ্গে রমজান সামনে রেখে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য ব্যবসায়ীরা ঋণপত্র খুলছেন। সব মিলিয়ে ডলারের চাহিদা বাড়ায় এর দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দর গত কয়েক মাসে ওঠানামা করেছে। গত ১৯ আগস্ট গড় দর ছিল ১২২ টাকা। এরপর ৬ আগস্ট ডলারের দর সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৮২ পয়সায় উঠেছিল; সর্বনিম্ন ছিল ১২৩ টাকা ৮০ পয়সা এবং গড় দর ছিল ১২৩ টাকা ৮১ পয়সা। পরে দর কমলেও এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে।
ব্যাংকভেদেও ডলারের কেনাবেচার দরে পার্থক্য রয়েছে। বুধবার রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ১০ পয়সা দরে বিক্রি করেছে এবং কিনেছে ১২৩ টাকা ১০ পয়সায়। বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংক বিক্রি করেছে ১২৪ টাকা ২৮ পয়সা দরে; কেনার দর ছিল ১২৩ টাকা ২৮ পয়সা।
খোলা বাজারে আরো বেশি দামে ডলার
খোলা বাজারে ডলারের দাম নির্ধারণে মানি চেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের বেঁধে দেওয়া দর অনুসরণ করা হচ্ছে। সংগঠনটি গত ২৪ আগস্ট থেকে মানি এক্সচেঞ্জগুলোর জন্য প্রতিদিন ডলারের কেনাবেচার দর নির্ধারণ করছে। সংগঠনটির সভাপতি এম এস জামান জানিয়েছেন, প্রতিদিন সকালে নির্ধারিত দর সংগঠনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় এবং সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেই দর অনুসরণ করতে হয়।
বুধবার নির্ধারিত দর অনুযায়ী, মানি এক্সচেঞ্জগুলো প্রতি ডলার ১২৮ টাকায় বিক্রি করেছে এবং কিনেছে ১২৭ টাকায়। এর আগের দিন মঙ্গলবার বিক্রয়মূল্য ছিল ১২৭ টাকা ৮০ পয়সা এবং ক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা ৮০ পয়সা। সোমবার ডলার কেনা হয়েছিল ১২৬ টাকা ৬০ পয়সায় এবং বিক্রি করা হয়েছিল ১২৭ টাকা ৬০ পয়সায়। এক মাস আগে, ১ অক্টোবর, ডলারের বিক্রয়মূল্য ছিল ১২৬ টাকা ৬০ পয়সা এবং ক্রয়মূল্য ১২৫ টাকা ৬০ পয়সা।
মানি এক্সচেঞ্জের নির্ধারিত দরের বাইরেও রাজধানীর মতিঝিল ও গুলশানে প্রতি ডলার ১২৮ টাকা ২০ পয়সায় বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডলার ব্যবসায়ীরা।
চাহিদার তুলনায় জোগান কম
মানি চেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এম এস জামান বুধবার বলেন, বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, অস্থিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বিশ্বব্যাপী ডলারের দাম বাড়ছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। নানা কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ফলে ডলারের চাহিদা বাড়লেও সেই অনুপাতে জোগান বাড়েনি। এ কারণেই দাম ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। তবে কিছুদিন পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নির্ধারিত দরের বাইরে ডলার কেনাবেচা ঠেকাতে সংগঠনটি কঠোরভাবে নজরদারি করছে বলেও জানান তিনি। তাঁর দাবি, বেঁধে দেওয়া দরের বাইরে কোনো ডলার কেনাবেচা হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ দিন গত ৩০ জুন আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা। এর আগে ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর এ হার ছিল ১২১ টাকা ৮৭ পয়সা।
চলতি সময়ে আমদানি ব্যয় ও ডলারের চাহিদার চাপ সামাল দিতে গিয়ে মুদ্রাবাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ব্যয় বাড়তে থাকলে ডলারের চাহিদা এবং বিনিময় হারের ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে বলে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
সানা/আপ্র/২৯/১০/২০২৬