আজ রোববার (৮ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত 'মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর : ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত পর্যালোচনা' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী ও কিনোট পেপার উপস্থাপন করেন এনডিজের প্রেসিডেন্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ হাসান নাসির।
বৈঠকে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির সহ:সেক্রেটারি জেনারেল জনাব হামিদুর রহমান আজাদ, সাবেক সচিব এএফএম সোলায়মান চৌধুরী, সাবেক সচিব মোতাহার হোসেন, সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত মোতালেব হোসেন, মানারত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর ড. আব্দুর রব, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি ব্যারিস্টার এএসএম শাহরিয়ার কবির, উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. শিব্বির আহমদ, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো: মহিউদ্দিন, মে: জে: (অব.) আমসা আমিন, সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, ডিইউজে সভাপতি জনাব শহীদুল ইসলাম, নিরাপত্তা বিশ্লেষক লে. জে. (অব) হাসান সোহরাওয়ার্দী, প্রফেসর ড. এস কে আকরাম আলী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবি আমাতুল্লাহ, সাবেক অতিরিক্ত সচিব আব্দুল হালিম, ডক্টর কামরুল হাসানসহ নৌ-পরিবহন ও বন্দর বিশেষজ্ঞ, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও গণমাধ্যমকর্মীরা।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির (অব.) বলেন, পায়রা বন্দর থেকে শুরু করে সোনাদিয়া এবং মাতারবাড়ী বন্দর পর্যন্ত এ জাতীয় মেগা প্রজেক্টগুলো অনেক আয়োজন করে শুরু হয়, অনেক টাকা পয়সা খরচ হয় কিন্তু এরপর তার অগ্রগতি সম্পর্কে আমরা আর জানতে পারি না। তা ছাড়া অদৃশ্য কারণে অনেক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়, স্থান পরিবর্তন হয়, সে ব্যাপারেও দেশের মানুষ জানেন না। এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা দরকার। ১৬/১৭ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে অথচ এখন পর্যন্ত পায়রা বন্দরে একটি জাহাজ ভিড়তে পারেনি। 'জায়কা'র দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের জন্য সোনাদিয়া উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। সেই হিসাব কেন উল্টিয়ে গেল! কার প্রয়োজনে? কোন অসুবিধায়? একটা অসুবিধা হিসেবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কথা আমরা শুনছি। সে কথা তো মাতারবাড়ী বন্দরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এগুলো আসল কথা না। এখন পর্যন্ত সব কিছু বিবেচনায় গভীর সমুদ্র বন্দরের জন্য সোনাদিয়া এগিয়ে। কেন এর ব্যতিক্রম হচ্ছে, তা দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট করতে হবে। মাতারবাড়ীও যেন পায়রা না হয়।
প্রফেসর ড. আব্দুর রব বলেন, এই বন্দরের স্থান নির্বাচন নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা আছে। আমরা একটি স্বাধীন দেশ। আমরা কোথায় পোর্ট করব সেটা আমাদের সিদ্ধান্ত। অন্য কারো স্বার্থ আমরা দেখতে যাব কেন? এখানে ভারতের স্বার্থ জড়িত এবং তারা চাচ্ছে মাতারবাড়ীতে বন্দর হোক। তারা কেন সোনাদিয়া চাচ্ছে না, কেন মাতারবাড়িতে চাচ্ছে, সেগুলো আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে জানতে হবে। সেজন্য আমাদের দেশপ্রেমিক সরকার দরকার। শুধু সরকার নয় বরং সকল দেশপ্রেমিক শক্তিকে এক হয়ে আমাদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে।
হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, আমার বাড়ি ওখানে। এ জন্য আমার ফিল্ডের অভিজ্ঞতা আছে। প্রথমে ১১টি স্পটে সার্ভে করা হয়েছিল। সেখান থেকেই সোনাদিয়ায় বন্দরের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। তারপর আন্তর্জাতিক চাপে সোনাদিয়া সিদ্ধান্তটা বাতিল করা হয়। তার মানে আমরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। এ বিষয়গুলো জনগণকেও জানানো হয়নি। পার্লামেন্টে আলোচনা করা হয়নি। এগুলো থেকে দলীয় ক্যাডাররা লাভবান হয়। সোনাদিয়াতে পরিবেশ নষ্টের যে কারণ দেখানো হলো, একই কারণ মাতারবাড়ীতেও দেখানো যায়। মাতারবাড়ীতে জমি অধিগ্রহণ হয়েছে অথচ সেই ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে দলীয় লোকজন। এখানে সড়ক সংযোগ আছে, যার প্রতি কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের খরচ ধরা হয়েছে ৪০০ কোটি টাকার বেশি! বন্দর নিয়েও আঞ্চলিক শক্তি আছে পরাশক্তি আছে সকলের ইনভলভমেন্ট আছে ভারতের স্বার্থ আছে। এখানে নিরাপত্তার বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অনুরোধ করব জাতিকে অন্ধকার রেখে কিছু করবেন না তাহলে আমরা সোচ্চার হব।
ব্যারিস্টার এএসএম শাহরিয়ার বলেন, পোর্টের ব্যাপারে চুপচাপে বন্দোবস্ত করে নিচ্ছেন এবং এর মাধ্যমে আপনি প্রথমেই মেনে নিচ্ছেন আপনি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ না। জাপান সার্ভে করে বলল, সোনাদিয়া বেস্ট প্লেস। তাহলে কোন অদৃশ্য কারণে পরে এটা সোনাদিয়া থেকে মাদার বাড়ি চলে গেল?
মেজর আখতার মহেশখালীর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। ৬৯ হাজার একর জমির উপর থাকা মহেশখালী নিয়ে তার স্টাডি আছে, অ্যানালাইসিস আছে- সে বিষয়ে তিনি সম্ভাবনাগুলোর কথা উল্লেখ করেন।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মহিউদ্দিন বলেন, পায়রা বন্দর নিয়েও অনেক কাহিনি করা হলো। শেষে দেখা গেল এখানে সমুদ্র বন্দর তো দূরের কথা নদীবন্দরই হচ্ছে না! অথচ এটাকী দেশের সর্ববৃহৎ প্রজেক্ট দেখিয়ে খরচ করা হলো। মাতারবাড়ীর জন্য ড্রেজিং খরচ ধরা হয়েছে বছরে ৩০০ কোটি টাকা। এগুলোর রিটার্ন কী?
নিরাপত্তা বিশ্লেষক লে. জে. (অব) হাসান সোহরাওয়ার্দী বলেন, আজকের সেমিনারের আলোচনার সাবজেক্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে আরেকটি দেশের সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে অথচ জনগণ তা জানতে পারছে না যে কী করা হচ্ছে? এগুলো শুধু দলের সুবিধ দেখা হয়, দলীয় লোক বা ব্যক্তির সুবিধা দেখা হয়। আমি এগুলোর প্রতিবাদ করলাম।
মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ট্রানজিট চুক্তির সময়ও আমরা অনেক গাল-গল্প শুনেছিলাম। ট্রানজিট চার্জ থেকেই আমরা সিঙ্গাপুর হয়ে যাব শুনেছিলাম। অথচ যখন চার্জ নেওয়ার সময় এলো, তখন বলা হলো, আমরা এত ছোটলোক না যে সামান্য ফি নেব। প্রধানমন্ত্রী জাপান সফর করলেন অথচ তার আগে এ বিষয়টি নিয়ে এ দেশে কোনো রকম আলোচনা হয়নি। এখন সরাসরি ভারত আমাদের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করতে পারছে না তাই জাপানকে দিয়ে ভারতের স্বার্থ মেটানোর চেষ্টা চলছে। এ বিষয়গুলোর দিকে আমাদের নজর রাখতে হবে।