নিম্নমানের গ্রাফিকস, অগোছালো গল্প আর অদ্ভুত নির্মাণশৈলীর কারণে সিনেমাটি দেখে দর্শকদের বিরক্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঘটেছে ঠিক উল্টো। সিনেমাটি কতটা খারাপ, সেটি দেখতেই প্রেক্ষাগৃহে ভিড় জমিয়েছেন দর্শকরা। আর সেই কৌতূহলেই চীনের বক্স অফিসে আয়ের ইতিহাস গড়েছে স্বল্পবাজেটের অ্যানিমেশন সিনেমা ‘নিউ লাই’।
একটি গরুর স্বপ্নকে কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমাটি মুক্তির প্রথম ১০ দিনে আয় করেছিল মাত্র ৭ হাজার ৭০৫ ইউয়ান। শুরুতে সিনেমাটি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ ছিল প্রায় নেই বললেই চলে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনেমাটির দুর্বল গ্রাফিকস, প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং অদ্ভুত সব দৃশ্য নিয়ে রসিকতা ছড়িয়ে পড়তেই পরিস্থিতি বদলে যায়। সিনেমাটি যে কতটা খারাপ, তা নিজের চোখে দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যেতে শুরু করেন দর্শকরা। অদ্ভুত এই কৌতূহলের জেরে রাতারাতি বাড়তে থাকে দর্শকসংখ্যা।
ফলাফলও চমকপ্রদ। স্বল্পবাজেটের সিনেমাটির আয় লাফিয়ে ১ কোটি ১৪ লাখ ইউয়ান ছাড়িয়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি মন্তব্য সিনেমাটি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দেয়। এক দর্শক মন্তব্য করেন, ছবিটি দেখলে হয়তো ৮০ মিনিট আফসোস হবে, কিন্তু না দেখলে সারা জীবন আফসোস করতে হবে।
এই কৌতূহলকে পুঁজি করেই বড় কোনো প্রচারণা ছাড়াই সিনেমাটি চীনের বক্স অফিসে বড় বাজেটের হলিউড সিনেমার সঙ্গে পাল্লা দিতে শুরু করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নত প্রযুক্তির যুগে ‘নিউ লাই’কে অনেকে ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখছেন। প্রযুক্তিগত নানা দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও চীনা দর্শকরা মজা করে সিনেমাটিকে ‘খাঁটি হাতে তৈরি কারুশিল্প’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। চলতি গ্রীষ্মে এটি হয়ে উঠেছে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত সাফল্যগুলোর একটি।
সিনেমাটির জনপ্রিয়তার পেছনে চীনের শেয়ারবাজারের সঙ্গেও এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। চীনা ভাষায় ‘নিউ’ শব্দটির সঙ্গে ‘ষাঁড়’ বা চাঙা শেয়ারবাজারের একটি প্রতীকী সম্পর্ক রয়েছে। দেশটির অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশাও সিনেমাটির প্রতি মানুষের আগ্রহ ও সমর্থন বাড়িয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
শুরুতে সিনেমাটির প্রচারপত্র ও পোস্টারের মানও ছিল বেশ নিম্নমানের। কিন্তু হঠাৎ দর্শক চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় হল কর্তৃপক্ষকে অতিরিক্ত প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে হয়। এমনকি কোথাও কোথাও কর্মীরা কাগজ ও রং দিয়ে নিজেরাই হাতে এঁকে পোস্টার তৈরি করে হলের সামনে টাঙিয়ে দেন। ঝকঝকে বড় বাজেটের পোস্টারের পাশে সেই হাতের আঁকা পোস্টারও দর্শকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
তবে এই অপ্রত্যাশিত সাফল্য নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম ‘বেইজিং নিউজ’-এর এক কলামে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, শুধু ব্যবসার স্বার্থে অতিরিক্ত নিম্নমানের সিনেমা প্রদর্শন করা হলে দীর্ঘমেয়াদে দর্শকরা প্রেক্ষাগৃহের ওপর আস্থা হারাতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সিনেমা হল কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বড় কোনো প্রচারণা ছাড়াই প্রায় দর্শকহীনভাবে যাত্রা শুরু করা ‘নিউ লাই’ এখন চীনের বক্স অফিসে এক অদ্ভুত ও অভাবনীয় চমকে পরিণত হয়েছে। সিনেমাটি ভালো না খারাপ—সেই বিতর্কের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে একটি প্রশ্ন, সিনেমাটি আসলেই কতটা জঘন্য? আর সেই প্রশ্নের উত্তর জানতেই এখন প্রেক্ষাগৃহে ছুটছেন দর্শকরা।
এসি/আপ্র/১৮/০৮/২০২৬