প্রয়াত শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু এবং তার স্মৃতিবিজড়িত ‘এলআরবি’ ব্যান্ডের সুরের ধারাকে পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে অমলিন রাখতে একটি সমন্বিত সংস্কৃতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছেন ‘উত্তরাধিকার’।
রূপালী গিটারের জাদুকরের স্মৃতি ও কালজয়ী সৃষ্টি অক্ষত রাখতে এই আয়োজন বলে জানিয়েছেন বাচ্চুর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনা। এই আয়োজনে আইয়ুব বাচ্চুর ২৪টি গান নিয়ে একটি বিশেষ ট্রিবিউট অ্যালবাম প্রকাশ হচ্ছে।
এছাড়া তার ব্যবহৃত গিটার ও স্মৃতি সংরক্ষণে মিউজিয়াম ও ক্যাফে ‘এবি’স কিচেন’ স্থাপন এবং চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে ধারাবাহিক কনসার্টের পরিকল্পনা করা হয়েছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দৈনিক পত্রিকা ডেইলি স্টার এর কার্যালয়ে রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে এই কাজের বিস্তারিত তুলে চন্দনা।
তিনি জানিয়েছেন, বিভিন্ন ব্যান্ডের শিল্পীরা আইয়ুব বাচ্চুর কালজয়ী ২৪টি গান নতুন করে গাইছেন। ইকবাল আসিফ জুয়েলের মাস্টারিংয়ে নির্মিত অ্যালবামটি প্রথম দফায় ডাবল সিডি এবং পরবর্তীতে ভিনাইল (এলপি) সংস্করণে প্রকাশ করা হবে। অ্যালবামটিতে স্থান পাওয়া গানগুলোর মধ্যে ব্যান্ড ‘দলছুট’ গাইবে বাচ্চুর ‘রূপালী গিটার’ গানটি। ‘আর্বোভাইরাস’ শোনাবে ‘নীল বেদনা’, ‘সোনার বাংলা সার্কাস’ গাইবে ‘গতকাল রাতে’, ‘শুভযাত্রা’ গাইবে ‘চলো বদলে যাই’, ‘একে রাহুল’ গেয়ে শোনাবেন ‘মন চাইলে মন’, ‘ক্যালিপসো’ গাইবে ‘চাঁদ মামা’, ‘রকসল্ট’ পরিবেশন করবে ‘অচেনা জীবন’ এবং ‘ডোপামিন’ গাইবে ‘মাধবী’ গানটি।
এছাড়াও একক শিল্পী হিসেবে বাবনা করিম, রাসেল আলী, রোমেল আলী, চন্দন জামান আলী, মেনন, কানিজ সুবর্ণা, সাজ্জাদ, পলাশ, আদিত, জয় শাহরিয়ার, বখতিয়ার হোসেন, আতিকা ইয়ামিন, অটমনাল মুন, কঙ্কণ আচার্য এবং তৌফিকের কণ্ঠে বাচ্চুর গান শোনা যাব ।
আইয়ুব বাচ্চুর ক্যাপ, টি-শার্ট, ব্যান্ডানা, মগ ও গিটার পিকসহ একটি সীমিত সংস্করণের ‘বক্স সেট’ হিসেবে সংগ্রাহকদের জন্য সরবরাহ করা হবে। ভ্যাটসহ প্রতিটি বক্স সেটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা, যা অনলাইন ও নির্দিষ্ট সরাসরি আউটলেটে পাওয়া যাবে।
আগামী ১৮ অক্টোবর আইয়ুব বাচ্চুর প্রয়াণ দিবসে অ্যালবামটির ভিনাইল এলপি সংস্করণটি বাজারে আসবে। সংবাদ সম্মেলনে আইয়ুব বাচ্চুর স্মৃতি সংরক্ষণে ‘এবি’স কিচেন’ নামের একটি জাদুঘর ও ক্যাফে গড়ে তোলার ইচ্ছে প্রকাশ করেন চন্দনা। সেখানে আইয়ুব বাচ্চুর আইকনিক গিটারগুলো সর্বসাধারণ ও ভক্তদের দর্শনের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
তিনি বলেন, ক্যাফেটিতে একটি লাইভ পারফরম্যান্স স্টেজ ও প্র্যাকটিস প্যাড থাকবে, যেন নতুন ও উদীয়মান ব্যান্ডগুলো তাদের নিয়মিত রেওয়াজ ও চর্চা চালিয়ে যেতে পারে। মেম্বারশিপ, টিকেট বিক্রির আয়ে এটি পরিচালিত হবে। বাচ্চুর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে নেওয়া এই উদ্যোগের পেছনের গল্প বলেছেন চন্দনা।
তিনি বলেন, “অনেকে এই প্রজেক্টের কথা শুনে খুব খুশি হইছে। সত্যি বলতে আমি চিন্তাও করতে পারি নাই যে এত নামকরা শিল্পী যারা আছেন, বাচ্চুর সিনিয়র-জুনিয়র সবাই তার সঙ্গে যারা কাজ করেছে, তারা সবাই যে এভাবে এগিয়ে আসবে। চিশতী ভাইয়ের (চিশতি ইকবাল) সঙ্গে একদিন কফি খাচ্ছিলাম, আর বলছিলাম আমার তো ছোট ছোট কিছু স্বপ্ন আছে।
সব গান তো শুধু ইউটিউব চ্যানেলেই থাকে, তাই ভেবেছিলাম একটা স্থায়ী প্রজেক্ট করা যায় কি না। নিউ জেনারেশনের পারফর্মাররা যদি খুশি হয়ে বাচ্চুর গানগুলো করতে চায়, তবেই করা যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “সেই রাতে চিশতী ভাই ফোন দিয়ে বললেন, তিনি চেষ্টা করছেন। তবে আমি শুরুতেই একটা জিনিস পরিষ্কার করে দিয়েছিলাম—সবাইকে তাদের প্রাপ্য সম্মানী ও মর্যাদা দিয়ে কাজ করতে হবে।
ফ্রি বলে কিছু নাই, কারণ শিল্পীরা অনেক স্ট্রাগল করে কাজ করেন। চিশতী ভাই যখন ডাবল অ্যালবামের চূড়ান্ত লিস্টটা আমার হাতে দিলেন, আমি একবাক্যে রাজি হয়ে গেলাম।” মিউজিয়াম ও ক্যাফে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে চন্দনা বলেন, “বাচ্চুর গিটারগুলো ঘরের কোণে আটকে রাখা আমার জন্য খুব টাফ।
ভক্তরা প্রায়ই গিটারগুলোর ছবি দেখতে চায়, কিন্তু আটকে রাখা অবস্থায় তো ওগুলোর সৌন্দর্য বোঝা যায় না। আমি চিশতী ভাইকে বলেছিলাম, আমার তো কোনো বড় স্বপ্নই পূরণ হয় না, আর মিউজিয়াম করতে গেলে প্রচুর টাকার প্রয়োজন, সিকিউরিটি ও প্রটেকশনের বিষয় আছে। আমি সরকারের কাছেও যেতে চাই না।
আমার ইচ্ছা ছিল শুধু মিউজিয়াম না, একটা হাব ও ক্যাফে টাইপের কিছু হবে—যেখানে একটা প্যাড থাকবে, সবাই গিয়ে গান গাইবে, নতুন নতুন প্রোগ্রাম হবে।” মাত্র এক মাস ১৫ দিনের মধ্যে প্রজেক্টটি বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যাওয়ায় ইকবাল চিশতীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি যুক্ত করেন, “মিটিংয়ের পর চিশতী ভাই যখন সব ট্র্যাক শোনালেন, আমি অভিভূত হয়েছি।
শিল্পীরা তাদের নিজস্ব কণ্ঠে গানগুলো গেয়েছেন। একদম বাচ্চুর মত গান হয়তো বাচ্চুর সন্তানও গাইতে পারবে না, কেউ কারও মত হয় না। তবে আমি মনে করি শিল্পী বেঁচে থাকা অবস্থায় এবং চলেও যাওয়ার পর এভাবেই নতুনদের মাধ্যমে শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।”
এলআরবি ব্যান্ডের অভিষেক অ্যালবামের স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানাতে আইয়ুব বাচ্চুর জন্মবার্ষিকী ১৬ আগস্ট থেকে তার প্রয়াণ দিবস ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ধারাবাহিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ‘কিং অব চিটাগাং’ ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে একটি বড় লাইভ কনসার্ট।
এছাড়া অগাস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে প্রচার করা হবে প্রজেক্টের ‘বিহাইন্ড দ্য সিন কনটেন্ট’ এবং প্রকাশ পাবে ২০টি অফিশিয়াল মিউজিক ভিডিও।
পরে ‘অ্যান অডিয়েন্স উইথ এবি’ নামের একটি ‘এক্সক্লুসিভ প্রাইভেট কনসার্ট’ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা টেলিভিশনে প্রচার হবে।
‘উত্তরাধিকার’ প্রজেক্টের সমস্ত মেধা স্বত্ব (ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি) ও বাণিজ্যিক অধিকার আইয়ুব বাচ্চুর পরিবার এবং গানগুলোর মূল গীতিকারদের কাছেই সংরক্ষিত থাকবে বলেও সংবাদ সস্মেলনে জানানো হয়।
ডিসি/আপ্র/১৭/০৮/২০২৬