বাংলা ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী, গিটারবাদক ও সুরকার আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন আজ। ১৯৬২ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম শহরে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী মাত্র ৫৬ বছরের জীবনে বাংলা সংগীতে রেখে গেছেন অনন্য অবদান। বেঁচে থাকলে আজ ৬৪ বছরে পা দিতেন তিনি।
১৯৮৩ সালে মাত্র ৬০০ টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা হিসেবে। সোলসসহ বিভিন্ন ব্যান্ডে কাজ করার পর ১৯৯০ সালে গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড লিটল রিভার ব্যান্ড, যা পরবর্তী সময়ে এলআরবি নামে পরিচিতি পায়।
গিটার হাতে মঞ্চে তার অনন্য পরিবেশনা এবং শক্তিশালী কণ্ঠ সংগীতপ্রেমীদের কাছে তাকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন ‘বস’, আবার অনেকের কাছে ‘স্যার’। সংগীতাঙ্গনে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন গিটারের জাদুকর হিসেবে।
মূলত রক সংগীতের শিল্পী হলেও নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট ঘরানায় সীমাবদ্ধ রাখেননি আইয়ুব বাচ্চু। আধুনিক গান, লোকগীতি ও চলচ্চিত্রের গানেও তিনি শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। কণ্ঠ, সুর ও গিটারের অনন্য সমন্বয়ে সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান।
তবে সংগীতের সাফল্যের আড়ালে তার ব্যক্তিজীবনে ছিল আবেগ, অভিমান ও নানা বেদনা। কাছের মানুষেরা তাকে আবেগপ্রবণ ও অভিমানী মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নিজের অনেক কষ্ট প্রকাশ না করে সেসব অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছেন গান ও সুরের মধ্য দিয়ে।
মায়ের মৃত্যুও তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। মায়ের প্রতি তার ভালোবাসার কথা বিভিন্ন সময় নিজেই বলেছেন। প্রিয় সহশিল্পীদের সঙ্গে বিচ্ছেদের ঘটনাও তাকে কষ্ট দিত। ব্যান্ডকে তিনি শুধু একটি সংগীতদল হিসেবে নয়, নিজের আরেকটি পরিবার হিসেবে দেখতেন।
আইয়ুব বাচ্চুর সবচেয়ে বড় ভালোবাসাগুলোর একটি ছিল গিটার। জীবনের বড় একটি সময় তিনি গিটার সংগ্রহ ও বাজানোর পেছনে ব্যয় করেছেন। বিভিন্ন দেশে গিয়ে নামী গিটারের দোকান ঘুরে বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করতেন। তার কাছে গিটার ছিল কেবল বাদ্যযন্ত্র নয়, আবেগ ও ভালোবাসার অংশ।
জীবনের শেষদিকে নিজের সংগ্রহে থাকা গিটারগুলো নিয়ে দেশব্যাপী একটি প্রতিযোগিতা আয়োজনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন, প্রতিভাবান গিটারবাদকেরা তার প্রিয় গিটারগুলো বাজানোর সুযোগ পান। তবে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি।
২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট নিজের শেষ জন্মদিন পালন করেন আইয়ুব বাচ্চু। ঘরোয়া সেই আয়োজনে কাছের মানুষদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন তিনি। সেদিনও নতুন কিছু করার স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন। এমন গান করতে চেয়েছিলেন, যা আগে কখনো করেননি—নিজেই লিখবেন, সুর করবেন এবং গাইবেন।
কিন্তু সেই জন্মদিনের মাত্র দুই মাস পর, ১৮ অক্টোবর ২০১৮ সালে আকস্মিকভাবে মারা যান বাংলা ব্যান্ড সংগীতের এই কিংবদন্তি।
তার মৃত্যুর পরও থেমে নেই তার সৃষ্টির পথচলা। জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এবার নতুন সংগীতায়োজনে প্রকাশ পাচ্ছে তার ২০টি কালজয়ী গান নিয়ে বিশেষ অ্যালবাম ‘উত্তরাধিকার’। এতে দেশের আটটি উদীয়মান ব্যান্ড ও ১২ জন একক শিল্পী কণ্ঠ দিয়েছেন।
অ্যালবামটিতে থাকছে আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় গান ‘চলো বদলে যাই’, ‘রুপালি গিটার’, ‘নীল বেদনা’, ‘গতকাল রাতে’, ‘চাঁদ মামা’, ‘অচেনা জীবন’, ‘মাধবী’ ও ‘বাংলাদেশ’সহ আরও কয়েকটি গান।
আইয়ুব বাচ্চু নেই, কিন্তু তার গান আছে। গিটারের সেই অনন্য সুর আর কণ্ঠের আবেগের মধ্য দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার কাছে বেঁচে থাকবেন বাংলা ব্যান্ড সংগীতের এই কিংবদন্তি।
এসি/আপ্র/১৬/০৮/২০২৬