গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

মেনু

পড়াশোনার পাশাপাশি পেঁপে চাষে সফল বেরোবির শিক্ষার্থী আকরাম

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮:২৫ পিএম, ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৯:০৮ এএম ২০২৬
পড়াশোনার পাশাপাশি পেঁপে চাষে সফল বেরোবির শিক্ষার্থী আকরাম
ছবি

নিজের বাগানে আকরাম আলী -প্রতিনিধির পাঠানো ছবি

গোলাম মোরশেদ তামি, বেরোবি প্রতিনিধি: বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা, আর অবসর সময়ে কৃষির মাঠে স্বপ্নের পরিচর্যা। চাকরির অপেক্ষায় না থেকে আত্মনির্ভর হওয়ার প্রত্যয়ে পেঁপে চাষ ও নার্সারি গড়ে তুলেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) বাংলা বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আকরাম আলী। গত বছরের অভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার ৪৩ শতাংশ জমিতে ৪৮০টি পেঁপেগাছ রোপণ করেছেন তিনি। পেয়েছেন আশাব্যঞ্জক ফলন। তাঁর এই উদ্যোগ একদিকে যেমন স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নকে এগিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় তরুণ ও কৃষকদেরও বাণিজ্যিক কৃষিতে আগ্রহী করে তুলছে। শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছেও আকরাম এখন শিক্ষিত তরুণদের কৃষিতে সম্পৃক্ত হওয়ার অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।

আকরাম আলীর বাড়ি দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার ৯ নম্বর হামিদপুর এলাকায়। পরিবারের সদস্য তিনজন - বাবা, মা ও তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি অবসর সময় কাজে লাগিয়ে কৃষিকাজ করেন আকরাম। ফসল নির্বাচন, চাষের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার বেশির ভাগ দায়িত্ব নিজেই পালন করেন। আর জমিতে নিয়মিত পরিচর্যা, সেচ ও দেখভালের কাজ করেন তাঁর বাবা-মা। পেঁপে চাষের পাশাপাশি নার্সারিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফল ও ফুলের চারা উৎপাদন করছেন তিনি।

চলতি বছর প্রথম ধাপে ২৫ শতাংশ জমিতে টপলেডি জাতের ৩০০টি পেঁপের চারা রোপণ করেন আকরাম। এতে তাঁর ব্যয় হয় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। পরে দ্বিতীয় ধাপে আরো ১৮ শতাংশ জমিতে ১৮০টি চারা রোপণ করেন। দুই ধাপে সব মিলিয়ে ৪৩ শতাংশ জমিতে তাঁর পেঁপেগাছের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮০টি।

গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম ধাপের চারা রোপণ করেছিলেন তিনি। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়েছে পেঁপে সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ। বর্তমানে বাজারে পেঁপের দাম তুলনামূলক কম থাকলেও পুরো মৌসুমে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার পেঁপে বিক্রির প্রত্যাশা করছেন আকরাম। তাঁর ভাষ্য, পেঁপেগাছ থেকে টানা দুই বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। ফলে বাগানটি আগামী বছরও ধরে রাখতে পারলে অতিরিক্ত ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা আয় হতে পারে।

আকরাম জানান, কাঁচা অবস্থায় পেঁপে সংগ্রহ করলে আরো আগেই বাজারজাত করা সম্ভব হতো। কিন্তু পাকা পেঁপের দাম কাঁচা পেঁপের তুলনায় প্রায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি। এ কারণে কিছুটা সময় নিয়ে পাকা পেঁপে বাজারে বিক্রি করছেন তিনি। এতে অপেক্ষা বেশি হলেও লাভের সম্ভাবনা বাড়ছে।

তবে এবারের সাফল্যের পেছনে রয়েছে আগের বছরের ব্যর্থতা থেকে পাওয়া শিক্ষা। গত বছর প্রথমবারের মতো প্রায় ১৮ শতাংশ জমিতে পেঁপে চাষ করেন আকরাম। অভিজ্ঞতার অভাবে তখন আশানুরূপ ফলন ও লাভ হয়নি। কিন্তু এতে দমে না গিয়ে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার আরো পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ শুরু করেন। জমি নির্বাচন, চারা রোপণ, সার প্রয়োগ, সেচ ও নিয়মিত পরিচর্যার বিষয়ে বাড়তি গুরুত্ব দেন। এবার তার সুফলও পেয়েছেন তিনি।

আকরামের এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও প্রভাব ফেলেছে। এলাকায় আগে থেকেই পেঁপে চাষ হয়ে আসছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীকে বাণিজ্যিকভাবে পেঁপে চাষ করতে দেখে স্থানীয় অনেক তরুণ ও কৃষক নতুন করে আগ্রহী হয়েছেন। তাঁর বাগান দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ইতোমধ্যে কয়েকজন পেঁপে চাষ শুরু করেছেন বলেও জানান আকরাম।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আকরাম বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে পেঁপে চাষ করছি। প্রথমবার ফলন কম হলেও দ্বিতীয়বার আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো হয়েছে। কৃষিতে সফল হতে হলে প্রথমেই সঠিক ফসল নির্বাচন ও জমি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে। পেঁপে চাষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জমি নির্বাচন। কারণ পেঁপেগাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তাই পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা রয়েছে, এমন জমি নির্বাচন করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।’

তরুণ এই উদ্যোক্তার মতে, কৃষি এখন কেবল জীবিকার মাধ্যম নয়, শিক্ষিত তরুণদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠারও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। তবে এ খাতে নতুনদের আগ্রহী করে তুলতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। আকরাম বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা তাঁর বাগান মনিটরিং করলেও নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে আশানুরূপ সহযোগিতা পাননি। গ্রামের অনেক মানুষ এখনো আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক পরামর্শ ও সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হলে কৃষিকে আরো আধুনিক ও লাভজনক করা সম্ভব।

তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিকাজ করছি নিজের আগ্রহ থেকেই। আমি মনে করি, শিক্ষিত তরুণরা যদি কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে, তাহলে কৃষি শুধু জীবিকা নয়, একটি লাভজনক উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্র হতে পারে।’

আকরামের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন তাঁর বিভাগের শিক্ষক ও সহপাঠীরাও। বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক খাইরুল ইসলাম পলাশ বলেন, ‘আমি ওর পোস্ট মাঝেমধ্যে দেখি। বিষয়টি আমার ভালো লাগে। এখনকার অনেক ছেলেমেয়ে কৃষিকাজকে ছোট করে দেখে। অথচ শিক্ষিত তরুণদের, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কৃষিতে এগিয়ে আসা দরকার। গ্রামের অনেক কৃষকের আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি এসব বিষয় নিয়ে গবেষণা করে এবং সেই জ্ঞান কৃষিতে কাজে লাগায়, তাহলে আমাদের কৃষি খাত অনেক এগিয়ে যাবে।’

আকরামের সহপাঠী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আকরাম আমাদের বন্ধু। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা সত্যিই প্রশংসনীয়। বর্তমানে অনেকেই শহরকেন্দ্রিক জীবনের দিকে ঝুঁকছেন। সেখানে সে প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে গিয়ে কৃষি ও গাছগাছালির সঙ্গে সময় কাটায়। একাডেমিক জীবনেও সে আমাদের সহপাঠীদের মধ্যে মেধাবীদের একজন। তার সিজিপিএও তুলনামূলক ভালো। আকরামের মতো শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনাময় কৃষি খাতের সঙ্গে যুক্ত হলে তা অনেক তরুণকে অনুপ্রাণিত করবে। তাকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হলে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে সে আরো ভালো কিছু করতে পারবে। মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সে আরো এগিয়ে যাক, এটাই প্রত্যাশা।’

আরেক সহপাঠী আব্দুল মালেক বলেন, ‘আকরাম পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের উদ্যোগে পেঁপে চাষ ও নার্সারি গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়। তার এই প্রচেষ্টা অন্য শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনার পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়ে ভাবতে উৎসাহিত করবে। আমি মনে করি, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সরকারি সহযোগিতা ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সুবিধা পেলে আকরাম ভবিষ্যতে আরো বড় পরিসরে কাজ করতে পারবে। তার এই উদ্যোগের সফলতা কামনা করি।’

পার্বতীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাজিব হুসাইন বলেন, ‘পেঁপে একটি সম্ভাবনাময় ও লাভজনক ফসল। উপযুক্ত জমি নির্বাচন, উন্নত জাতের চারা এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে পেঁপে চাষে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। তরুণ শিক্ষার্থীরা কৃষিতে এগিয়ে এলে কৃষির আধুনিকায়ন ও বাণিজ্যিকীকরণ আরো গতিশীল হবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে কৃষির মাঠ - দুই জায়গাতেই নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করছেন আকরাম আলী। তাঁর কাছে পেঁপে বাগান কেবল আয়ের উৎস নয়, পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক। চাকরির অপেক্ষায় না থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিকেও যে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়া যায়, আকরামের উদ্যোগ যেন সেই বার্তাই দিচ্ছে।
সানা/আপ্র/৪/১১/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

৫১তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা
০৪ নভেম্বর ২০২৬

৫১তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা

৫১তম বিসিএস (বিশেষ) বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা ১১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। ওইদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা...

এইচএসসি খাতা পুনর্নিরীক্ষণে চার দিনে আবেদন পাঁচ লাখ
০৪ নভেম্বর ২০২৬

এইচএসসি খাতা পুনর্নিরীক্ষণে চার দিনে আবেদন পাঁচ লাখ

চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনে সাড়া পড়েছে।...

উদয়নে ছাত্রীদের হয়রানির প্রতিবাদে বিক্ষোভ, শাস্তির মুখে ১০ শিক্ষার্থী
০৪ নভেম্বর ২০২৬

উদয়নে ছাত্রীদের হয়রানির প্রতিবাদে বিক্ষোভ, শাস্তির মুখে ১০ শিক্ষার্থী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রীর ছবি কৃত্রিম বুদ...

নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান
০৩ নভেম্বর ২০২৬

নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান

গোলাম মোরশেদ তামি, বেরোবি প্রতিনিধি: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা, সাম্য ও অসাম্প্রদা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

রাস্তায় যারা এখন আন্দোলন করছে তাদের সঙ্গে শ্রমিকদের কোনো সম্পর্ক নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাস্তায় যারা এখন আন্দোলন করছে তাদের সঙ্গে শ্রমিকদের কোনো সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য একটি মহল অপচেষ্টা করছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সচিবালয়ে চিংড়ি মহাল ব্যবস্থাপনা বিষয়ক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় যোগ দিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি মন্ত্রীর এই বক্তব্যকে সঠিক মনে করেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 18 ঘন্টা আগে