জাহাঙ্গীর আলম: যশোরের কেশবপুরে আলোচিত জোড়া খুনের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। পরকীয়া প্রেমের সম্পর্কের জেরে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। হত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে এক নারীসহ দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামতও উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, গত ৩১ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কেশবপুর উপজেলার ব্রাহ্মণডাঙ্গা গ্রামের প্রভাত বিশ্বাসের ধানিজমিতে সেচ মেশিনের পানি পড়ার স্থানে অজ্ঞাতপরিচয় দুই ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে কেশবপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ দুটির পরিচয় শনাক্ত করে।
এ ঘটনায় নিহতদের মেয়ে সাবিনা খাতুন বাদী হয়ে থানায় এজাহার দায়ের করেন। এরপর কেশবপুর থানা পুলিশের একটি দল গোয়েন্দা নজরদারি ও বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে গত সোমবার (২ নভেম্বর) জেসমিন বেগমকে গ্রেফতার করে। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপর আসামি মোস্তফা কামালকেও গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার দুজন হলেন জেসমিন বেগম (৩৮), স্বামী নুর ইসলাম সরদার এবং মোস্তফা কামাল (৪৫), পিতা মৃত কেসমত সরদার। তাঁদের উভয়ের বাড়ি কেশবপুর উপজেলার মাগুরখালী গ্রামের সর্দারপাড়ায়।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেসমিন বেগম ও নিহত মাজেদা অভয়নগরের আকিজ জুট মিলে সহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। গত ৩০ অক্টোবর শুক্রবার মিল বন্ধ থাকায় সকালে বাড়ির কাজ শেষ করে বস্তা ও কাঁচি নিয়ে মাজেদার সঙ্গে মাঠে ঘাস কাটতে যান জেসমিন।
মাঠে যাওয়ার পথে তাঁরা দেখতে পান, মাজেদার স্বামী আলেক নুর ইসলাম নিজের জমিতে ঘাস লাগাচ্ছেন। কিছুটা সামনে মোস্তফা কামাল তাঁর জমিতে কপির চারা রোপণ করছিলেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মোস্তফার সঙ্গে গত চার-পাঁচ মাস ধরে জেসমিনের পরকীয়া সম্পর্ক চলছিল। মাঠে কাজ করার সময় জেসমিন ও মোস্তফাকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেন মাজেদা। এ সময় তিনি জেসমিনকে নাম ধরে ডাকেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মোস্তফা ও জেসমিন কৌশলে মাজেদা ও তাঁর স্বামী আলেককে কলমিশাক তোলার কথা বলে ঘেরের ভেড়ির দিকে নিয়ে যান। তালতলার ভেড়ির কাছে পৌঁছালে মোস্তফা তাঁর হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র (পাসনি) দিয়ে আলেকের বগলের নিচে ও মাথায় আঘাত করেন। একই সময়ে জেসমিন মাজেদার ওড়না দিয়ে তাঁর গলায় ফাঁস লাগিয়ে কলাগাছের মধ্যে ফেলে দেন।
শারীরিক প্রতিবন্ধী আলেক আঘাতের পর আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি। মোস্তফা তাঁকে একটি পুরোনো সেলো মেশিনের গর্তে ফেলে দেন। অন্যদিকে, গলায় ফাঁস দেওয়ার পরও মাজেদার শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে দেখে তাঁকে হত্যার জন্য আরো নৃশংসতার আশ্রয় নেন অভিযুক্তরা। কাঁচি দিয়ে মাজেদার পোশাক উঁচু করে তলপেট ও পায়ে একাধিকবার আঘাত করা হয়। মোস্তফাও তাঁর পায়ে কোপ দেন। পরে তাঁকেও সেলো মেশিনের গর্তে ফেলে দেওয়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, দুজনের মৃত্যু নিশ্চিত করার পর আলেকের শরীরের ওপর তাঁর গায়ের গামছা ঠিক করে দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কাঁচিটিও ঘেরের পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, জোড়া খুনের ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে গ্রেফতার দুজনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সানা/আপ্র/৪/১১/২০২৬