একেএম ফজলুল হক: দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীর দুই তীরে ১ হাজার ২৯টি উদ্ভিদ প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। এসব উদ্ভিদের মধ্যে ৫১৭টি ঔষধি প্রজাতির। এ ছাড়া ১২৩টি প্রজাতির উদ্ভিদ বিপন্ন অথবা বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব উদ্ভিদ সংরক্ষণে দেশীয় প্রজাতির গাছের চারা রোপণ, দুর্লভ উদ্ভিদের অবস্থান চিহ্নিতকরণ এবং নিয়মিত পরিচর্যার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকরা।
গতকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) চট্টগ্রামের একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক বছরব্যাপী গবেষণার এসব তথ্য তুলে ধরে বেসরকারি সামাজিক উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থা ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান ওপিনিয়ন (ইকো)। গবেষণায় সহযোগিতা করেছে বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস (বিএসআরএম)। গত মাসে গবেষণার কাজ শেষ হয়।
গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক (রাসেল) সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। গবেষণার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন একই বিভাগের সাবেক সভাপতি ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন। গবেষণা দলের অন্য সদস্যরা হলেন মোহাম্মদ খন্দকার রাজিউর, সজীব রুদ্র, মোহাম্মদ আরিফ হোসাইন, শহিদুল ইসলাম, টুকি মারমা ও সনাতন চন্দ্র বর্মণ। বিএসআরএমের পক্ষে বক্তব্য দেন রুনি রহমান।
গবেষণায় শনাক্ত ১ হাজার ২৯টি উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে ৭৬৫টি স্থানীয় এবং ২৪৪টি বিদেশি। উদ্ভিদের ধরন অনুযায়ী রয়েছে ১১২টি বড় বৃক্ষ, ১৩৩টি গুল্ম, ১৩৩টি লতা, ৫২২টি বীরুৎ ও ৯টি পরজীবী উদ্ভিদ। বিপন্ন উদ্ভিদের তালিকায় রয়েছে বাটনা, লেইস্যা গর্জন, চাউ তাল, ঈশ্বরমূল, পাখা টেকিয়া ও পানিজামসহ বেশ কয়েকটি প্রজাতি। এ ছাড়া ৭২৯টি উদ্ভিদ প্রজাতির প্রথম নথিভুক্তির তথ্য পাওয়া গেছে।
হালদা নদীর দূষণ ও পরিবেশগত সংকটের কারণও গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে। এতে শিল্পবর্জ্য, কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, প্লাস্টিক বর্জ্য, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, নদী খননের মাটি তীরে স্তূপ করে রাখা এবং অনিয়ন্ত্রিত মাছ আহরণকে দূষণ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি কর্ণফুলী নদীর দূষণও হালদার জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে উল্লেখ করা হয়।
হালদা নদী ও এর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইকোর পক্ষ থেকে ১৩ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিপন্ন উদ্ভিদ সংরক্ষণ, দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ, নদীর প্রাকৃতিক উদ্ভিদ আচ্ছাদন পুনরুদ্ধার, শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য শোধন, প্লাস্টিকদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নদী খননের মাটির পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা।
অধ্যাপক ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন বলেন, নদীর তীরে অপরিকল্পিতভাবে বিদেশি প্রজাতির গাছ লাগানোর পরিবর্তে স্থানীয় পরিবেশ ও মাটির উপযোগী দেশীয় গাছ রোপণ করতে হবে। দুর্লভ প্রজাতির চারা রোপণে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। গাছ লাগানোর পর নিয়মিত পরিচর্যার দায়িত্বও নির্ধারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, নদীর দুই তীরের উদ্ভিদ মাটির ক্ষয় ও ভাঙন রোধ এবং বৃষ্টির পানি মাটিতে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, ড্রেজিংয়ের কারণে নদীর তলদেশের জলজ পরিবেশ এবং ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও জুপ্ল্যাঙ্কটনের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব উপাদান পুনরুদ্ধারে তিন থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে।
বিএসআরএমের পক্ষ থেকে রুমিন রহমান বলেন, সরকার ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তবে শুধু বৃক্ষরোপণ করলেই হবে না, কোন এলাকায় কোন প্রজাতির গাছ উপযোগী, তা বিবেচনায় নিতে হবে। বিপন্ন ও দুর্লভ উদ্ভিদের অবস্থান চিহ্নিত করে সেগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। এ গবেষণার তথ্য সরকারি পর্যায়েও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সানা/আপ্র/৪/১১/২০২৬