জ্বালানি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। বিশেষত রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি শুধু একটি পণ্যের বাজারমূল্য বাড়ার ঘটনা নয়, এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে প্রতিটি পরিবারের খাদ্যব্যয়, জীবনযাত্রার মান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর। এমন বাস্তবতায় এক মাসের ব্যবধানে বেসরকারি খাতের ১২ কেজি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ সাধারণ মানুষের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। সেপ্টেম্বরের ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে অক্টোবরে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা এবং নভেম্বরে ২ হাজার ৬০ টাকা-মাত্র দুই মাসে ৪৭৫ টাকা মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর নতুন ব্যয়ের বোঝা চাপিয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি এলপিজির সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম এক মাসে প্রায় ১৩৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৭৭৬ টাকা ৯৩ পয়সা থেকে ১ হাজার ৮৬০ টাকা করা হয়েছে। অটোগ্যাসের দামও প্রতি লিটারে ৭ টাকা ৩৩ পয়সা বেড়েছে। এসব সিদ্ধান্তের সম্মিলিত প্রভাব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
নিঃসন্দেহে এলপিজি আমদানিনির্ভর পণ্য। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের মূল্যবৃদ্ধি, জাহাজভাড়া, আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের হিসাবে, নভেম্বর মাসে সৌদি আরামকোর ঘোষিত গড় চুক্তিমূল্য প্রতি মেট্রিক টনে ৭৫৯ ডলার, যা আগের মাসের তুলনায় ৪৬ দশমিক ৫০ ডলার বেশি। কেবল এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম মূসকসহ প্রায় ৭৪ টাকা বাড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দাম বেড়েছে ২২৩ টাকা। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির বাইরেও মূল্য নির্ধারণের অন্যান্য উপাদান বিশ্লেষণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষভাবে প্রশ্ন উঠেছে, কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি যেখানে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৭৬ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছিল, সেখানে চূড়ান্ত মূল্য ২ হাজার ৬০ টাকা হলো কীভাবে? অতিরিক্ত ৮৪ টাকা নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। গণশুনানি আয়োজনই যথেষ্ট নয়; শুনানিতে উত্থাপিত মতামত, কারিগরি মূল্যায়ন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মধ্যে যৌক্তিক সম্পর্কও জনগণের কাছে স্পষ্ট করতে হবে। সরকারি এলপিজির দাম এক মাসে প্রায় ১৩৯ শতাংশ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্তের প্রভাব ও যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা জরুরি।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মূল্য এবং ভোক্তার প্রকৃত ক্রয়মূল্যের মধ্যে প্রায়ই ব্যবধান তৈরি হয়। পরিবহন, মজুতকরণ, বোতলজাতকরণ, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার চার্জের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ থাকলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে হবে। কমিশন নির্ধারিত দামের বেশি বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু শুধু বিজ্ঞপ্তি জারি করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। নিয়মিত বাজার তদারকি, অভিযোগ গ্রহণ, দ্রুত তদন্ত এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থায় কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও অযৌক্তিক মুনাফার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
নীতিগতভাবে সরকারের সামনে এখন তিনটি অগ্রাধিকার জরুরি। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, ব্যয় উপাদান ও কমিশনের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমদানিনির্ভরতা ও সরবরাহঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি, পর্যাপ্ত মজুত সক্ষমতা এবং বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, সাশ্রয়ী সরকারি এলপিজির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ন্ত্রণ করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু সেই বাজারের অভিঘাত সাধারণ মানুষের ওপর কতটা পড়বে, তা নীতিনির্ধারণ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, রান্নার গ্যাস কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি নাগরিক জীবনের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। তাই মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা, সরবরাহে শৃঙ্খলা এবং ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করাই হওয়া উচিত সরকারের দায়িত্বশীল নীতির প্রকৃত মানদণ্ড।
সানা/আপ্র/৪/১১/২০২৬