গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

মেনু

পোশাকশিল্পের সংকট: দোষারোপ নয়, চাই ন্যায্য মজুরি ও সমাধান

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৭:২৯ পিএম, ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৮:১৩ এএম ২০২৬
পোশাকশিল্পের সংকট: দোষারোপ নয়, চাই ন্যায্য মজুরি ও সমাধান
ছবি

ফাইল ছবি

দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প আজ গভীর অস্থিরতার মুখে। ন্যায্য মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং একের পর এক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ১ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে শ্রমিক অসন্তোষের জেরে তিন শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়। গ্রেফতার হয়েছেন অনেকে। পরদিনও গাজীপুরে দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। কয়েক হাজার ব্যক্তিকে আসামি করে মামলাও হয়েছে। কিন্তু এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে-শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও জীবনধারণের নিশ্চয়তা কে দেবে?

শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি এক দিনে তৈরি হয়নি। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যয়ের চাপে বর্তমান মজুরিতে শ্রমিকদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছিল। এরপর তিন বছর পার হতে চললেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয় নিশ্চিত হয়নি। কোনো শ্রমিকের সহকারীর বেতন আট থেকে সাড়ে আট হাজার টাকা, কোথাও হাজিরা বোনাস ৫০০ টাকা-এ বাস্তবতা উপেক্ষা করে শিল্পে স্থিতিশীলতা আশা করা অবাস্তব।

অন্যদিকে মালিক ও শ্রমিকের আয়, সুযোগ-সুবিধা ও জীবনমানের ব্যবধানও গভীর উদ্বেগের বিষয়। শিল্পের মুনাফা, রপ্তানি আয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতার কথা বলা হয়; কিন্তু উৎপাদনের প্রধান শক্তি শ্রমিকের জীবনমান নিশ্চিত করার প্রশ্নে কেন এত অনীহা? গ্যাস ও জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার দায় শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া চলে না। এসব সংকট মোকাবিলা, শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মালিক-শ্রমিকের স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার দায় শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির দাবিকে অযৌক্তিক করে না।

সরকার ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কারখানার কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতারও শ্রমিকদের কাজে ফিরে গিয়ে বোর্ডের মাধ্যমে দাবি আদায়ের আহ্বান জানিয়েছেন। এসব উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে শুধু বোর্ড গঠন কিংবা কাজে ফেরার আহ্বান যথেষ্ট নয়। বোর্ডকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাস্তবসম্মত মজুরি সুপারিশ করতে হবে। বর্তমান বাজারদর, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যয়ের নিরপেক্ষ পর্যালোচনার ভিত্তিতে মজুরি নির্ধারণ জরুরি। একই সঙ্গে নিয়মিত মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি পুনর্বিবেচনার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

শ্রমিক আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে কোনো মহল অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া পুরো শ্রমিক আন্দোলনকে পরাজিত অপশক্তির ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। কয়েক হাজার ব্যক্তিকে একসঙ্গে আসামি করে মামলা, নির্বিচার গ্রেফতার কিংবা বলপ্রয়োগ পরিস্থিতি আরো জটিল করতে পারে। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হামলা ও নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও ন্যায্য দাবি জানানোর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা মনে করি, পোশাকশিল্প রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ দমন নয়, ন্যায়সংগত সমাধান। সরকারকে মালিক, শ্রমিক, শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয়, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং কারখানার সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের জীবন বিপন্ন রেখে শিল্পের সমৃদ্ধি সম্ভব নয়। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি উৎপাদন ও রপ্তানির পরিবেশ সুরক্ষাও অপরিহার্য। দোষারোপের রাজনীতি নয়, বৈষম্যহীন মজুরি, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগই পারে পোশাকশিল্পকে এই সংকট থেকে উদ্ধার করতে। 
সানা/আপ্র/০৩/১১/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

রিকশা নিয়ন্ত্রণে চালক ও যাত্রীর ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা নয়
০১ নভেম্বর ২০২৬

রিকশা নিয়ন্ত্রণে চালক ও যাত্রীর ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা নয়

ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, বেপরোয়া গতি, অপরিকল্পিত পার্কিং, যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি...

জাপানের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন জরুরি
৩১ অক্টোবর ২০২৬

জাপানের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন জরুরি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি, উন্নয়ন অংশীদারত্ব ও আঞ...

তাহসিফের রহস্যজনক মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক
৩০ অক্টোবর ২০২৬

তাহসিফের রহস্যজনক মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক

একজন সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, এটি আইনশৃঙ্খলা, নাগরিক...

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে শোকাহত পরিবারের...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই