রেস্তোরাঁয় পছন্দের খাবার খেতে খেতে একসময় মনে হয়, আর খাওয়া সম্ভব নয়। পেট একেবারে ভরা। কিন্তু খাবার শেষে সামনে চকোলেট কেক, আইসক্রিম কিংবা রসালো কোনো মিষ্টি পরিবেশন করা হলে বদলে যায় পরিস্থিতি। একটু আগেও যার আর খাওয়ার ইচ্ছা ছিল না, তিনিই হয়তো ডেজার্টের প্লেট সাবাড় করে ফেলেন। তখন মনে হয়, পেটে বুঝি মিষ্টির জন্য আলাদা জায়গা রয়েছে।
কিন্তু পেট ভরা থাকার পরও নতুন কোনো খাবার দেখলে কেন আবার খেতে ইচ্ছা করে? এর পেছনে রয়েছে মস্তিষ্ক ও খাবারের স্বাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ এক মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘সেন্সরি-স্পেসিফিক স্যাটাইটি’। বাংলায় একে বলা যায় সংবেদননির্ভর তৃপ্তি।
একই খাবারে একঘেয়েমি, নতুন স্বাদে বাড়ে আগ্রহ
নিউইয়র্কের বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণগত চিকিৎসা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক লেন এপস্টাইনের মতে, খাবারের বৈচিত্র্য এ ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। কোনো একটি খাবার বারবার খেতে থাকলে ধীরে ধীরে সেটির প্রতি আগ্রহ কমে আসে। কারণ, খাবারটির স্বাদ, গন্ধ ও অনুভূতি আমাদের পরিচিত হয়ে যায়। ফলে সেটি আর আগের মতো আকর্ষণীয় মনে হয় না।
কিন্তু একই সময়ে সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের কোনো খাবার এলে সেটির প্রতি আগ্রহ আবার বেড়ে যায়। যেমন, বিরিয়ানি বা ভারী নোনতা খাবার খাওয়ার পর পেট ভরে গেলেও চকোলেট কেক কিংবা আইসক্রিম দেখলে খেতে ইচ্ছা করে। নতুন স্বাদের আকর্ষণে মস্তিষ্ক আগের খাবার থেকে পাওয়া তৃপ্তির অনুভূতিকে কিছুটা পেছনে সরিয়ে দেয়।
গবেষণাতেও মিলেছে প্রমাণ
অধ্যাপক লেন এপস্টাইনের ২০১১ সালের একটি গবেষণায় খাবারের বৈচিত্র্যের এই প্রভাব দেখা যায়। গবেষণায় ৩২ জন নারীকে দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। এক দলকে সপ্তাহের প্রতিদিন ম্যাকারনি অ্যান্ড চিজ খেতে দেওয়া হয়। অন্য দল এই খাবারটি পেত সপ্তাহে মাত্র এক দিন।
গবেষণায় দেখা যায়, যাঁরা প্রতিদিন একই খাবার খেয়েছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমেছে। অর্থাৎ একই স্বাদের খাবার বারবার খেতে খেতে তাঁদের আগ্রহ কমে গিয়েছিল।
বুফেতে বেশি খাওয়ার পেছনেও একই কারণ
এই কারণেই বুফে রেস্তোরাঁয় গিয়ে অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার খেয়ে ফেলেন। সেখানে একের পর এক নতুন পদ, ভিন্ন স্বাদ ও নানা ধরনের ডেজার্ট থাকে। একটি খাবারে তৃপ্তি আসার পরও অন্য খাবারের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। একইভাবে ভারী খাবারের পর মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছাও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিজ্ঞানীদের মতে, খাবারের বৈচিত্র্যের প্রতি এই আগ্রহের একটি প্রাকৃতিক দিকও রয়েছে। শরীর সুস্থ রাখতে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন। ফল, শাকসবজি ও প্রোটিনসহ নানা খাবার থেকে শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ পায়। বিভিন্ন স্বাদের খাবারের প্রতি আগ্রহ খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
কখন এই অভ্যাস বাড়তি খাওয়ার কারণ হয়?
পেনসিলভেনিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বারবারা রোলসের গবেষণাতেও খাবারের বৈচিত্র্য ও অতিরিক্ত খাওয়ার সম্পর্ক উঠে এসেছে। আধুনিক সময়ে আমাদের চারপাশে নানা স্বাদের উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার সহজেই পাওয়া যায়। ফলে পেট ভরে যাওয়ার পরও নতুন খাবারের আকর্ষণে অনেকে খেতে থাকেন।
নিয়মিত এমন হলে শরীরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যালরি জমতে পারে, যা ওজন বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এ ছাড়া মিষ্টি খাবার খাওয়ার সময় মস্তিষ্কের পুরস্কার-সম্পর্কিত ব্যবস্থাও সক্রিয় হয়। ডোপামিনের মতো রাসায়নিক উপাদান আনন্দ ও ভালো লাগার অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। তাই মিষ্টি খাবার অনেকের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। খাবারের পর নিয়মিত ডেজার্ট খাওয়ার অভ্যাস থাকলে সেই সময়ে মিষ্টির প্রতি আগ্রহ আরও বাড়তে পারে।
পেট ভরার পরও খাওয়ার ইচ্ছা কমাবেন যেভাবে
পেট ভরে যাওয়ার পরও মিষ্টি বা অন্য খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হলে খাবারের ধরন ও পরিমাণের বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। ভারী খাবারের পর ডেজার্ট খেতে ইচ্ছা করলে অল্প পরিমাণে ফল বেছে নিতে পারেন। আম, আপেল, কমলা কিংবা মৌসুমি ফল মিষ্টি স্বাদের চাহিদা মেটাতে সাহায্য করতে পারে।
তাই পেট ভরে যাওয়ার পরও ডেজার্ট দেখে জিভে পানি আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এর পেছনে কাজ করে স্বাদের বৈচিত্র্য, মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া এবং খাবারসংক্রান্ত অভ্যাস। তবে নতুন স্বাদের আকর্ষণে যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাওয়া না হয়ে যায়, সেদিকে খেয়াল রাখাই ভালো।
সূত্র: পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়, ভেরি ওয়েল হেলথ, এনডিটিভি
এসি/আপ্র/০৩/১১/২০২৬