রাজধানী ঢাকা আজ এক গভীর নগর সংকটের মুখোমুখি। জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, যানজট ও তীব্র তাপপ্রবাহের মতো সমস্যায় যখন নগরবাসীর জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে, তখনও উন্নয়নের নামে ঢাকার অবশিষ্ট উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, খেলার মাঠ ও সবুজ অঞ্চল সংকুচিত হওয়ার প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একটি শহরের প্রাণশক্তি শুধু তার বহুতল ভবন, সড়ক কিংবা অবকাঠামোর বিস্তারে নয়; বরং নির্ভর করে সেই শহর কতটা মানুষের বসবাসযোগ্য, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব তার ওপর। তাই উন্নয়নের নামে যদি নগরের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের জায়গাগুলো ধ্বংস করা হয়, তবে তা কোনোভাবেই প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে না।
সম্প্রতি পান্থকুঞ্জ পার্ক নিয়ে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা ঢাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। তারা স্পষ্টভাবে বলেছেন, নগর উন্নয়নের পরিকল্পনায় নাগরিক অধিকার, পরিবেশগত ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যের বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এই বক্তব্য শুধু একটি পার্ক রক্ষার দাবি নয়; এটি একটি মানবিক, টেকসই ও ভবিষ্যৎমুখী নগর ব্যবস্থাপনার দাবি।
ঢাকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো পরিকল্পনাহীন নগর বিস্তার। বিশ্বের আধুনিক শহরগুলোতে উন্মুক্ত স্থানকে নগরের অপরিহার্য অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ঢাকায় অনেক ক্ষেত্রেই পার্ক, মাঠ ও জলাধারকে অব্যবহৃত জমি হিসেবে দেখা হয়েছে, যার ফলে বিভিন্ন সময় এসব জায়গা দখল, সংকোচন কিংবা অন্য কাজে ব্যবহারের প্রবণতা দেখা গেছে। অথচ পরিবেশবিজ্ঞান ও নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিতে একটি গাছ, একটি মাঠ কিংবা একটি জলাআরো শহরের টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। একটি রাজধানীকে আধুনিক, গতিশীল ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর করতে অবকাঠামো নির্মাণের বিকল্প নেই। কিন্তু উন্নয়নের ধারণা যদি শুধু কংক্রিটের বিস্তার, যান চলাচলের সুবিধা কিংবা বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে আনবে। কারণ মানুষের বসবাসের উপযোগিতা হারানো একটি শহর কখনোই সফল নগর হতে পারে না।
পান্থকুঞ্জ পার্ক সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে বিপুলসংখ্যক গাছ অপসারণের অভিযোগ বিশেষভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। গাছ কেবল সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না; এগুলো নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, বায়ুর মান উন্নত করে, বৃষ্টির পানি ধারণে সহায়তা করে এবং জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে যেখানে বিশ্বের বড় বড় শহরগুলো সবুজায়ন বাড়ানোর জন্য বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, সেখানে ঢাকার বিদ্যমান সবুজ অঞ্চল রক্ষার পরিবর্তে সংকুচিত করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছু নয়।
এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। কোনো বড় প্রকল্প অনুমোদনের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, জনমত গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে। শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি নয়, প্রকল্পের সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্যও বিবেচনায় নিতে হবে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। নগর পরিকল্পনায় স্বচ্ছতা ও জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো আধুনিক শহর গড়ে উঠতে পারে না। একই সঙ্গে আবাসন বা বাণিজ্যিক স্বার্থ যেন কখনোই সাধারণ মানুষের জীবনমান ও পরিবেশগত নিরাপত্তার ওপর প্রাধান্য না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের সিদ্ধান্তের ওপর। আমরা যদি এখনই উন্মুক্ত স্থান, সবুজ এলাকা ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় কঠোর অবস্থান না নিই, তাহলে আগামী প্রজন্মকে একটি অসহনীয়, উত্তপ্ত ও বসবাসের অনুপযোগী নগর উপহার দিতে হবে। উন্নয়ন হতে হবে মানুষের জন্য, প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়। তাই প্রয়োজন এমন এক নগর দর্শন, যেখানে ভবন থাকবে, সড়ক থাকবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থাকবে-কিন্তু তার পাশাপাশি থাকবে মানুষের নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা। কারণ একটি শহরের প্রকৃত সৌন্দর্য তার উচ্চ ভবনে নয়, তার মানবিকতা ও বাসযোগ্যতায়।
সানা/আপ্র/২৭/৭/২০২৬