হাওরাঞ্চল এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক ও মানবিক সংকটের মুখোমুখি। টানা বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধির ফলে কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ হাওরে বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে কৃষকের জীবন এক গভীর অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত হয়েছে। বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে হাজারো কৃষক পরিবার আজ নিঃস্বতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে; যা শুধু ফসলহানি নয়, বরং একটি জীবিকা ব্যবস্থার ভাঙনের নির্মম চিত্র।
সরেজমিন ও বিভিন্ন প্রশাসনিক তথ্যে স্পষ্ট, হাওরাঞ্চলে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে পানির নিচে চলে গেছে। কোথাও আধাপাকা ধান, কোথাও পাকা ফসল-সবই অকাল বন্যার আগ্রাসনে নষ্ট হচ্ছে। কৃষকেরা ধারদেনা করে, উচ্চ মজুরিতে শ্রমিক এনে, দিনরাত পরিশ্রম করে যে ফসল ফলিয়েছিলেন, তা এখন চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় কৃষকেরা বুকসমান পানিতে নেমে শেষ চেষ্টা চালাচ্ছেন ধান কাটার, কিন্তু অব্যাহত বৃষ্টি, শ্রমিক সংকট এবং দ্রুত পানি বৃদ্ধির কারণে সেই চেষ্টাও তেমন ফল দিচ্ছে না। এর ফলে শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, জাতীয় খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও গুরুতর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
এমন সংকটের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তিন মাসের সহায়তার ঘোষণা এসেছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সহায়তা নিঃসন্দেহে কৃষকের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কিছুটা লাঘব করতে পারে। তবে হাওরের বাস্তবতা বলছে, এই সহায়তার পরিমাণ ও প্রকৃতি যদি উৎপাদন পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হয়, তাহলে সংকটের গভীরতা কমবে না।
কারণ কৃষকের ক্ষতি কেবল আয় হারানো নয়; এটি পরবর্তী মৌসুমের উৎপাদন চক্র ভেঙে পড়ার ঝুঁকি। অনেক কৃষক ইতোমধ্যেই ঋণের ভারে জর্জরিত, ফসল হারিয়ে তারা আবার নতুন করে বীজ, সার, শ্রম ও জমি প্রস্তুতির অর্থ জোগাতে সক্ষম নাও হতে পারেন। ফলে প্রকৃত পুনর্বাসন না হলে হাওরাঞ্চলে খাদ্য উৎপাদন কমে গিয়ে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় সহায়তার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কৃষককে দ্রুত পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা। অর্থাৎ সহায়তা কেবল ভোগ্য অনুদান নয়, বরং উৎপাদনমুখী পুনরুদ্ধার প্যাকেজ হতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে স্বল্পমেয়াদি ঋণ, বিনামূল্যে বা ভর্তুকিযুক্ত বীজ ও সার, এবং দ্রুত পুনরায় চাষাবাদের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি জলাবদ্ধ জমি দ্রুত পুনরুদ্ধার ও পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পুনরায় বপন বা রোপণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
উল্লেখ করা অপরিহার্য- হাওর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদী ও খাল ভরাট হয়ে যাওয়া এবং পানি নিষ্কাশনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা প্রতি বছরই একই ধরনের বিপর্যয় তৈরি করছে। তাই এই সংকট মোকাবিলায় শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, একটি বৈজ্ঞানিক ও দীর্ঘমেয়াদি হাওর উন্নয়ন ও সুরক্ষা পরিকল্পনা এখন অপরিহার্য।
হাওরের কৃষক আজ কেবল সহায়তা চান না; তারা চান পুনরায় দাঁড়ানোর সুযোগ। তাদের হারানো ফসল ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, কিন্তু আগামী মৌসুমে তারা যেন আবার মাঠে ফিরতে পারেন, সেটাই রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব। সহায়তা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা কৃষককে পুনরায় বীজ বুনতে, জমি প্রস্তুত করতে এবং উৎপাদনে ফিরে যেতে সক্ষম করবে।
হাওরের এই বিপর্যয় তাই কেবল দুর্যোগ নয়, এটি একটি নীতি পরীক্ষাও। রাষ্ট্র যদি দ্রুত, সমন্বিত ও উৎপাদনমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে, তবেই কৃষকের কান্না ভবিষ্যতের খাদ্য সংকটে রূপ নেবে না।
সানা/আপ্র/৩/৫/২০২৬