গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

মেনু

অকাল বন্যার থাবায় হাওরাঞ্চল, কৃষকের হাহাকার ও রাষ্ট্রের করণীয়

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৬:৪৪ পিএম, ০৩ মে ২০২৬ | আপডেট: ০৮:২৯ এএম ২০২৬
অকাল বন্যার থাবায় হাওরাঞ্চল, কৃষকের হাহাকার ও রাষ্ট্রের করণীয়
ছবি

বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে হাজারো কৃষক পরিবার আজ নিঃস্বতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে -ছবি সংগৃহীত

হাওরাঞ্চল এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক ও মানবিক সংকটের মুখোমুখি। টানা বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধির ফলে কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ হাওরে বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে কৃষকের জীবন এক গভীর অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত হয়েছে। বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে হাজারো কৃষক পরিবার আজ নিঃস্বতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে; যা শুধু ফসলহানি নয়, বরং একটি জীবিকা ব্যবস্থার ভাঙনের নির্মম চিত্র।

সরেজমিন ও বিভিন্ন প্রশাসনিক তথ্যে স্পষ্ট, হাওরাঞ্চলে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে পানির নিচে চলে গেছে। কোথাও আধাপাকা ধান, কোথাও পাকা ফসল-সবই অকাল বন্যার আগ্রাসনে নষ্ট হচ্ছে। কৃষকেরা ধারদেনা করে, উচ্চ মজুরিতে শ্রমিক এনে, দিনরাত পরিশ্রম করে যে ফসল ফলিয়েছিলেন, তা এখন চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় কৃষকেরা বুকসমান পানিতে নেমে শেষ চেষ্টা চালাচ্ছেন ধান কাটার, কিন্তু অব্যাহত বৃষ্টি, শ্রমিক সংকট এবং দ্রুত পানি বৃদ্ধির কারণে সেই চেষ্টাও তেমন ফল দিচ্ছে না। এর ফলে শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, জাতীয় খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও গুরুতর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

এমন সংকটের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তিন মাসের সহায়তার ঘোষণা এসেছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সহায়তা নিঃসন্দেহে কৃষকের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কিছুটা লাঘব করতে পারে। তবে হাওরের বাস্তবতা বলছে, এই সহায়তার পরিমাণ ও প্রকৃতি যদি উৎপাদন পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হয়, তাহলে সংকটের গভীরতা কমবে না।

কারণ কৃষকের ক্ষতি কেবল আয় হারানো নয়; এটি পরবর্তী মৌসুমের উৎপাদন চক্র ভেঙে পড়ার ঝুঁকি। অনেক কৃষক ইতোমধ্যেই ঋণের ভারে জর্জরিত, ফসল হারিয়ে তারা আবার নতুন করে বীজ, সার, শ্রম ও জমি প্রস্তুতির অর্থ জোগাতে সক্ষম নাও হতে পারেন। ফলে প্রকৃত পুনর্বাসন না হলে হাওরাঞ্চলে খাদ্য উৎপাদন কমে গিয়ে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় সহায়তার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কৃষককে দ্রুত পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা। অর্থাৎ সহায়তা কেবল ভোগ্য অনুদান নয়, বরং উৎপাদনমুখী পুনরুদ্ধার প্যাকেজ হতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে স্বল্পমেয়াদি ঋণ, বিনামূল্যে বা ভর্তুকিযুক্ত বীজ ও সার, এবং দ্রুত পুনরায় চাষাবাদের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি জলাবদ্ধ জমি দ্রুত পুনরুদ্ধার ও পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পুনরায় বপন বা রোপণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

উল্লেখ করা অপরিহার্য- হাওর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদী ও খাল ভরাট হয়ে যাওয়া এবং পানি নিষ্কাশনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা প্রতি বছরই একই ধরনের বিপর্যয় তৈরি করছে। তাই এই সংকট মোকাবিলায় শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, একটি বৈজ্ঞানিক ও দীর্ঘমেয়াদি হাওর উন্নয়ন ও সুরক্ষা পরিকল্পনা এখন অপরিহার্য।

হাওরের কৃষক আজ কেবল সহায়তা চান না; তারা চান পুনরায় দাঁড়ানোর সুযোগ। তাদের হারানো ফসল ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, কিন্তু আগামী মৌসুমে তারা যেন আবার মাঠে ফিরতে পারেন, সেটাই রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব। সহায়তা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা কৃষককে পুনরায় বীজ বুনতে, জমি প্রস্তুত করতে এবং উৎপাদনে ফিরে যেতে সক্ষম করবে।
হাওরের এই বিপর্যয় তাই কেবল দুর্যোগ নয়, এটি একটি নীতি পরীক্ষাও। রাষ্ট্র যদি দ্রুত, সমন্বিত ও উৎপাদনমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে, তবেই কৃষকের কান্না ভবিষ্যতের খাদ্য সংকটে রূপ নেবে না।
সানা/আপ্র/৩/৫/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে সত্যও নিরাপদ নয়
২৬ জুন ২০২৬

যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে সত্যও নিরাপদ নয়

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি বন্দুকের নল, জনসমাবেশের ভিড় কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানে নয়; তার শক্তি নিহিত থাকে...

নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কতটা যৌক্তিক?
২৩ জুন ২০২৬

নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কতটা যৌক্তিক?

একটি রাষ্ট্রের করব্যবস্থার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ন্যায়, সাম্য ও সক্ষমতাভিত্তিক অবদান। যে নাগরিকের আয়...

ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও শিক্ষার সমন্বয়ে গড়ে উঠুক শক্তিশালী বাংলাদেশ
২২ জুন ২০২৬

ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও শিক্ষার সমন্বয়ে গড়ে উঠুক শক্তিশালী বাংলাদেশ

প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত খেলা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

২০২৫ সালে সেবা খাতে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা

দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে ২০২৫ সালে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ আনুমানিক ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, এই পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আপনি কি মনে করেন এই জরিপ সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে