গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

মেনু

পদ্মার জলে ভাসে লাশ, সড়কে ঝরে জীবন

রাষ্ট্রের নীরবতায় মৃত্যু-উৎসব

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৩:০৭ পিএম, ২৮ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১৫:২২ এএম ২০২৬
রাষ্ট্রের নীরবতায় মৃত্যু-উৎসব
ছবি

ফাইল ছবি

দৌলতদিয়ার পদ্মা আজ শুধু একটি দুর্ঘটনার সাক্ষী নয়, এক অব্যক্ত গণকবরের নিঃশব্দ আর্তনাদ হয়ে উঠেছে। নদীর বুকে ভেসে ওঠা সেই ডুবন্ত বাস যেন লোহার খাঁচায় বন্দী কয়েক ডজন স্বপ্নের শেষ নিশ্বাস। একসঙ্গে ২৬টি প্রাণের নিভে যাওয়া কোনো আকস্মিক বিপর্যয় নয়-এটি আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের শৈথিল্য, উদাসীনতা ও দায়হীনতার এক নগ্ন ও নির্মম দলিল।

সেই বাসে ছিল নিঃশব্দে মায়ের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়া শিশু, ছিল জীবিকার ক্লান্তি শেষে ঈদের আনন্দ নিয়ে কর্মস্থলে ফেরার আশায় বুক বাঁধা শ্রমজীবী মানুষ, ছিল ভবিষ্যতের রঙিন প্রতিশ্রুতিতে ভরা তরুণ প্রাণ। অথচ এক মুহূর্তের অব্যবস্থাপনা, এক ফোঁটা দায়িত্বহীনতা, একটুখানি অবহেলা-সবকিছু কেড়ে নিলো নির্মমভাবে। পদ্মার গভীরে তলিয়ে যাওয়া সেই বাস যেন কেবল মানুষ নয়, আমাদের মানবিকতা, আমাদের বিবেক, আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতাকেও ডুবিয়ে দিলো। প্রশ্ন জাগে-আমরা কি সত্যিই জেগে আছি?

এই শোকের রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে আসে আরো ভয়াবহ সত্য-ঈদযাত্রার মাত্র সাত দিনে দুই শতাধিক প্রাণহানি। এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রতিটি ঘরে ঘরে নেমে আসা অন্ধকারের নাম। এদিকে সরকারি হিসাব ও বেসরকারি পরিসংখ্যানের ফারাক প্রমাণ করে-আমরা এখনো সত্য স্বীকার করতে ভয় পাই। অথচ সত্য আড়াল করলে মৃত্যু থামে না; বরং আরো নির্দয় হয়ে ওঠে।

তাই প্রশ্ন এখন আরো তীক্ষ্ম-এই মৃত্যুগুলো কি দুর্ঘটনা, নাকি এটি ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড? বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন যান, অদক্ষ চালক, আইনের দুর্বল প্রয়োগ-এই পুরনো ব্যাখ্যাগুলো আজ আর অজুহাত হতে পারে না। যদি একই কারণে বারবার মানুষ মরে, তবে তা আর দুর্ঘটনা নয়-তা পরিকল্পিত ব্যর্থতা।
রাষ্ট্র যদি কেবল শোকবার্তা দিয়ে দায় সারে, তবে তা এক নিষ্ঠুর প্রহসন। প্রতিটি প্রাণহানির দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে-আইনের কঠোর প্রয়োগে, ব্যবস্থাপনার শুদ্ধতায় এবং জবাবদিহির বাস্তবতায়।

প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ-
প্রথমত, সব গণপরিবহনের বাধ্যতামূলক ফিটনেস পরীক্ষা এবং ডিজিটাল নিবন্ধন নিশ্চিত করতে হবে; ফিটনেসবিহীন কোনো যান সড়কে নামলেই তাৎক্ষণিক জব্দ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চালকদের জন্য মানসম্মত প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে-ক্লান্ত ও অদক্ষ চালকের হাতে আর কোনো প্রাণ তুলে দেওয়া যাবে না।
তৃতীয়ত, সড়ক ও ফেরিঘাটসহ সব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সর্বক্ষণিক নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে কোনো অব্যবস্থাপনা মুহূর্তেই শনাক্ত হয়।
চতুর্থত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে-দুর্ঘটনার প্রতিটি ঘটনায় দায় নির্ধারণ করে দৃশ্যমান শাস্তি দিতে হবে।
পঞ্চমত, মহাসড়কে ধীরগতির ও অননুমোদিত যান চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে সড়কের ওপর অযাচিত চাপ কমে।

তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে হবে আমাদের মানসিকতায়। নিয়ম ভাঙাকে বুদ্ধিমত্তা মনে করা, ঝুঁকিকে অবহেলা করা-এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে কোনো আইনই কার্যকর হবে না। প্রতিটি যাত্রী, চালক, পথচারীকে বুঝতে হবে-সড়কে এক মুহূর্তের অসতর্কতা মানেই একটি জীবনের অবসান।

দৌলতদিয়ার পদ্মা আজ যে লাশ ভাসিয়েছে, তা কেবল ২৬টি প্রাণের সমাপ্তি নয়-এটি আমাদের বিবেকের পরাজয়। এই পরাজয় যদি এখনো আমাদের না নাড়িয়ে দেয়, তবে সামনে অপেক্ষা করছে আরো দীর্ঘ মৃত্যুমিছিল।

এখন সময় শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার, প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে নামানোর। কারণ প্রতিটি প্রাণের মূল্য আছে, প্রতিটি জীবনের অধিকার আছে নিরাপদে বেঁচে থাকার। এই অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব-আর এই দায়িত্ব পালনে প্রতিটি বিলম্ব মানেই আরেকটি অনিবার্য মৃত্যু।
সানা/আপ্র/২৮/৩/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে সত্যও নিরাপদ নয়
২৬ জুন ২০২৬

যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে সত্যও নিরাপদ নয়

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি বন্দুকের নল, জনসমাবেশের ভিড় কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানে নয়; তার শক্তি নিহিত থাকে...

নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কতটা যৌক্তিক?
২৩ জুন ২০২৬

নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কতটা যৌক্তিক?

একটি রাষ্ট্রের করব্যবস্থার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ন্যায়, সাম্য ও সক্ষমতাভিত্তিক অবদান। যে নাগরিকের আয়...

ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও শিক্ষার সমন্বয়ে গড়ে উঠুক শক্তিশালী বাংলাদেশ
২২ জুন ২০২৬

ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও শিক্ষার সমন্বয়ে গড়ে উঠুক শক্তিশালী বাংলাদেশ

প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত খেলা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

২০২৫ সালে সেবা খাতে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা

দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে ২০২৫ সালে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ আনুমানিক ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, এই পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আপনি কি মনে করেন এই জরিপ সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে