অগ্নিঝরা মার্চ আমাদের কেবল স্মৃতির কাছে নয়, দায়বদ্ধতার কাছেও ফিরিয়ে আনে। ২৫ মার্চের কালরাত্রির বিভীষিকা, ২৬ মার্চের প্রভাতে স্বাধীনতার ঘোষণা-এই দুই প্রান্তের মধ্যেই নিহিত একটি জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিহাস। শেখ মুজিবুর রহমান-এর ঐতিহাসিক আহ্বান এবং পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান-এর ঘোষণাপাঠ বিশ্ববাসীর কাছে সেই আহ্বান পৌঁছে দেয়-এই ধারাবাহিকতা কোনো একক ব্যক্তির নয়, বরং একটি জাতির সম্মিলিত আত্মপ্রকাশের প্রতীক।
কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও আমরা এখনো ইতিহাসের মৌলিক সত্য নির্ধারণে বিভক্ত। এটি কেবল রাজনৈতিক মতভেদ নয়; এটি রাষ্ট্রচিন্তার একটি গভীর সংকট। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির দীর্ঘদিনের পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ইতিহাসকে একটি নীতিনির্ধারণমূলক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ইতিহাস হয়ে উঠেছে প্রমাণভিত্তিক গবেষণার বিষয় নয়, বরং ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে পরিবর্তিত এক বয়ান।
এই প্রবণতা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। কারণ, রাষ্ট্রের বৈধতা কেবল ভৌগোলিক সীমারেখায় নির্ধারিত হয় না; তা নির্ধারিত হয় তার ইতিহাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি অভিন্ন জাতীয় চেতনায়। যখন সেই চেতনা বিভক্ত হয়, তখন রাষ্ট্রের ভেতরে অনিশ্চয়তা জন্ম নেয়, আর বাইরে তৈরি হয় দুর্বলতার ধারণা।
বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক সূচক এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। যে দেশ একসময় অবজ্ঞার শিকার হয়েছিল, সেই দেশ আজ উন্নয়নশীল বিশ্বের এক সম্ভাবনাময় উদাহরণ। কিন্তু উন্নয়নের এই সাফল্য ইতিহাসগত অনিশ্চয়তার ওপর দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই স্থিতিশীল হয়, যখন তার জনগণ তাদের অতীত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও অভিন্ন ধারণা ধারণ করে।
অতএব, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো স্বাধীনতার ইতিহাসকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক, নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য কাঠামোর মধ্যে নির্ধারণ করা। এ লক্ষ্যে একটি স্বাধীন জাতীয় ইতিহাস কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যেখানে ইতিহাসবিদ, গবেষক, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা প্রমাণভিত্তিক দলিলপত্রের আলোকে একটি গ্রহণযোগ্য কালক্রম ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করবেন। সেই ইতিহাস হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, প্রজন্মান্তরে শিক্ষার ভিত্তি।
এছাড়া, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের উপস্থাপন-সবখানে একটি নীতিগত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মতভেদ থাকবে, কিন্তু মৌলিক সত্য নিয়ে বিভ্রান্তি থাকবে না-এই নীতিই হতে হবে রাষ্ট্রের অবস্থান।
স্বাধীনতা কেবল অর্জনের ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিটি প্রজন্মকে তা নতুন করে ধারণ করতে হয়, রক্ষা করতে হয়। বিভক্ত ইতিহাস সেই প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে, আর ঐক্যবদ্ধ ইতিহাস তাকে শক্তিশালী করে।
আজকের এই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক-ইতিহাসকে আর দ্বন্দ্বের অস্ত্র বানানো নয়, বরং তা হোক ঐক্যের ভিত্তি। কারণ, যে স্বাধীনতা রক্তে অর্জিত, তা বিভক্তির রাজনীতির কাছে পরাজিত হলে-তা হবে ইতিহাসের প্রতি, আত্মত্যাগের প্রতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক গভীর অবিচার।
সানা/আপ্র/২৬/৩/২০২৬