গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬

মেনু

২৫ মার্চের কালরাত্রি পেরিয়ে স্বাধীনতার অভ্যুদয়

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৫:৪৬ পিএম, ২৫ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১৬:৫৬ এএম ২০২৬
২৫ মার্চের কালরাত্রি পেরিয়ে স্বাধীনতার অভ্যুদয়
ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে ২৫ মার্চ এক গভীরতম বেদনার, একই সঙ্গে এক অনিবার্য জাগরণের দিন। ১৯৭১ সালের এই দিবাগত রাত্রি কেবল একটি নৃশংস সামরিক অভিযানের সূচনাক্ষণ ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির বিরুদ্ধে পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নগ্ন প্রকাশ। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা সেদিন অস্ত্রের সর্বগ্রাসী শক্তি দিয়ে বাঙালির গণতান্ত্রিক অভিপ্রায়, জাতীয় আত্মমর্যাদা, সাংস্কৃতিক সত্তা এবং স্বাধীন সত্তার আকাঙক্ষাকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের বিধান ভিন্ন। যেখানেই দমনচক্র চরমে পৌঁছেছে, সেখানেই প্রতিরোধ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। ২৫ মার্চের কালরাত্রিও শেষ পর্যন্ত সেই অনিবার্য সত্যেরই সাক্ষ্য বহন করে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ গণরায়, ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি, আলোচনার নামে প্রতারণা এবং অসহযোগ আন্দোলনের অভূতপূর্ব পটভূমির পর ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে বাঙালির ন্যায়সংগত অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার আর কোনো অবকাশ অবশিষ্ট নেই। যে রাষ্ট্র নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলে, সে রাষ্ট্র নৈতিক ভিত্তি হারায়। সে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক তখন আর রাজনৈতিক বিরোধের সীমায় আবদ্ধ থাকে না; তা পরিণত হয় অস্তিত্বের প্রশ্নে। অতএব, ২৫ মার্চ ছিল সেই সন্ধিক্ষণ, যখন স্বাধীনতা কেবল একটি রাজনৈতিক দাবি নয়, বাঙালির অস্তিত্বরক্ষার অপরিহার্য শর্তে পরিণত হয়।

সেদিনের অভিযান ছিল পরিকল্পিত এবং বহুমাত্রিক। এর লক্ষ্য ছিল কেবল জনতাকে আতঙ্কিত করা নয়; একই সঙ্গে বাঙালির সম্ভাব্য প্রতিরোধশক্তিকে স্তব্ধ করে দেওয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল, পিলখানা, রাজারবাগ, নীলক্ষেতসহ বিভিন্ন স্থানে যে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়, তা প্রমাণ করে এই অভিযান ছিল একটি জাতিকে নেতৃত্বশূন্য, মেধাশূন্য ও মনোবলহীন করার প্রচেষ্টা। শিক্ষক, ছাত্র, পুলিশ, সাধারণ মানুষ-কেউ সেই বর্বরতার বাইরে থাকেননি। নগরীর অগ্নিদীপ্ত রাত শুধু ধ্বংসের চিত্রই বহন করেনি; তা বয়ে এনেছিল এক গভীর জাতীয় বোধ-এ অবমাননার প্রতিকার আর কোনো আপসের পথে সম্ভব নয়।

এই প্রেক্ষাপটেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার আহ্বান ঐতিহাসিক তাৎপর্য লাভ করে। ২৫ মার্চের অন্ধকার তাই নিছক বিপর্যয়ের প্রতীক নয়; এটি পরদিনের প্রতিরোধের ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য সূচনার প্রাক্কাল। বাঙালি জাতি সেদিন উপলব্ধি করেছিল, আর পশ্চাদপসরণের অবকাশ নেই। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পুলিশ, ইপিআরের বাঙালি সদস্য, সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে একই সত্যে উপনীত হয়-এ সংগ্রাম আর স্বায়ত্তশাসনের নয়, এ সংগ্রাম স্বাধীনতার। ২৫ মার্চের পর বাঙালি জাতির ইতিহাস তাই অন্য এক গতিপথে প্রবেশ করে; যে পথের পরিণতি ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়।

২৫ মার্চকে স্মরণ করার তাৎপর্য এখানেই যে, এটি আমাদের শোকের মধ্যে আবদ্ধ রাখে না; বরং শোককে শপথে, ক্ষতকে চেতনায় এবং স্মৃতিকে দায়িত্বে রূপান্তরিত করতে শেখায়। গণহত্যা কেবল অতীতের ঘটনা নয়; এটি মানবসভ্যতার বিবেকের প্রতি এক স্থায়ী প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হয় স্মরণে, সত্য প্রতিষ্ঠায় এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে। অতএব, গণহত্যা দিবস পালনের উদ্দেশ্য নিছক আনুষ্ঠানিকতা হতে পারে না। এর মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে ইতিহাসকে যথার্থ মর্যাদায় ধারণ করা, নতুন প্রজন্মকে সত্যের সঙ্গে পরিচিত করা, এবং জাতীয় চেতনার ভিতকে সুদৃঢ় করা।

আমাদের আরো মনে রাখতে হবে, স্বাধীন বাংলাদেশ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘ বঞ্চনা, রাজনৈতিক প্রতারণা, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং সীমাহীন আত্মত্যাগের ফসল। ২৫ মার্চ সেই ইতিহাসের এক বিভীষিকাময় সূচনা, কিন্তু একই সঙ্গে সেই দিনই স্বাধীনতার অপরিহার্যতার প্রশ্নকে চূড়ান্তভাবে স্পষ্ট করে দেয়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাঙালিকে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল; তবে বাস্তবে তারা বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। তারা ভয় দেখিয়ে আত্মসমর্পণ আদায় করতে চেয়েছিল; কিন্তু ফলত একটি জাতিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পথে অবিচল করে তুলেছিল। এখানেই ২৫ মার্চের ঐতিহাসিক তাৎপর্য।

আজ, গণহত্যা দিবসে, জাতির কর্তব্য দ্বিমুখী। একদিকে শহীদদের প্রতি গভীরতম শ্রদ্ধা নিবেদন; অন্যদিকে স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃতি, বিস্মৃতি ও উদাসীনতার হাত থেকে রক্ষা করা। যে জাতি তার আত্মত্যাগের ইতিহাস ভুলে যায়, সে জাতি তার ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত রাখতে পারে না। অতএব, ২৫ মার্চ আমাদের কেবল শোকস্মরণে আহ্বান জানায় না; এটি আমাদের নৈতিক দৃঢ়তা, ঐতিহাসিক সচেতনতা এবং জাতীয় দায়িত্ববোধ পুনর্নবীকরণেরও দিন।

সুতরাং ২৫ মার্চের কালরাত্রি আমাদের ইতিহাসে পরাজয়ের প্রতীক নয়। এটি সেই অগ্নিক্ষণ, যখন বাঙালি জাতি রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে। সেই কালরাত্রি পেরিয়েই স্বাধীনতার অভ্যুদয় ঘটে। এই কারণেই ২৫ মার্চ আমাদের কাছে একই সঙ্গে বেদনার, বোধের এবং শপথের দিন-জাতিস্মৃতিতে চিরভাস্বর এক মহামুহূর্ত।
সানা/আপ্র/২৫/৩/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

ঈদ হোক মমতার মহোৎসব
১৯ মার্চ ২০২৬

ঈদ হোক মমতার মহোৎসব

আলোকিত হৃদয়ের ডাক

কৃষক, খাল ও রাষ্ট্রদর্শনের পুনর্জাগরণ
১৮ মার্চ ২০২৬

কৃষক, খাল ও রাষ্ট্রদর্শনের পুনর্জাগরণ

মাটির শিরায় জলের প্রত্যাবর্তন

যুদ্ধের চাপ বাংলাদেশে, এখনই দূরদর্শী নীতির সময়
১৭ মার্চ ২০২৬

যুদ্ধের চাপ বাংলাদেশে, এখনই দূরদর্শী নীতির সময়

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে-দূরের সংঘাতের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। মধ্য...

ঈদযাত্রায় শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক
১৫ মার্চ ২০২৬

ঈদযাত্রায় শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

ঈদ ঘিরে প্রতি বছরই দেশের বড় শহরগুলো থেকে গ্রামে ফেরার বিশাল মানবস্রোত তৈরি হয়। কর্মব্যস্ত নগরজীবনে ছ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই