সংযমের নীরব সাধনা শেষে দিগন্তে ভেসে ওঠে এক নির্মল আনন্দের বার্তা-পবিত্র ঈদুল ফিতর। এক মাসের রোজা আমাদের ভেতরের অস্থিরতাকে থামিয়ে দেয়, আত্মাকে শুদ্ধ করে, হৃদয়কে করে কোমল ও উদার। সেই সাধনারই পরিণতি এই ঈদ-যেখানে আনন্দ শুধু বাহ্যিক নয়, গভীর এক মানবিক অনুভূতির নাম।
ঈদের সকাল যেন এক নতুন সূর্যোদয়। শিশুর হাসি, নতুন পোশাকের মৃদু গন্ধ, রান্নাঘরে সেমাই আর মিষ্টির সুবাস-সব মিলিয়ে জীবনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় এক অনন্য আবেশে। এবারের দীর্ঘ প্রায় ১০ দিনের ছুটি সেই আনন্দকে আরো বিস্তৃত করে দেবে। ব্যস্ত শহর ছেড়ে মানুষ ফিরবে গ্রামে, ফিরে পাবে শিকড়ের টান, মায়ের স্নেহ, আপনজনের সান্নিধ্য। যাত্রাপথের ক্লান্তিও যেন এবার কিছুটা কম, ফলে ঈদের আনন্দে থাকবে স্বস্তির ছোঁয়া।
তবু ঈদের সৌন্দর্য কেবল ব্যক্তিগত পরিতৃপ্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন এক উৎসব, যেখানে হৃদয়ের দরজা খুলে দিতে হয় অন্যের জন্য। সম্পর্কের দূরত্ব মুছে ফেলে হাত বাড়ানোর আহ্বানই ঈদের প্রকৃত ভাষা। ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগুক, অভিমান গলে যাক, অপরিচিতও হয়ে উঠুক আপন-এই হোক আমাদের নীরব প্রতিজ্ঞা।
সমাজের প্রান্তিক মানুষের চোখেও যেন ঝলমল করে ঈদের আলো-এটি কোনো দয়া নয়, বরং আমাদের মানবিক দায়। যাদের জীবন প্রতিদিনের সংগ্রামে আবদ্ধ, তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সামান্য হাসি উপহার দেওয়াই হতে পারে ঈদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কারণ, ভাগাভাগি করা আনন্দই প্রকৃত আনন্দ।
এই সময়ে বিশ্বজুড়ে যে অস্থিরতার ছায়া, তা আমাদের উৎসবের আনন্দকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে। কোথাও যুদ্ধ, কোথাও ধ্বংস, কোথাও মানুষের আর্তনাদ-এই বাস্তবতা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। তাই এই ঈদের প্রার্থনা হোক-পৃথিবী থেকে সহিংসতার অবসান ঘটুক, অস্ত্রের ঝনঝনানি থেমে যাক, মানবতার জয় হোক সর্বত্র।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটেও সময়টি তাৎপর্যপূর্ণ। বহু প্রতীক্ষার পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। মানুষের প্রত্যাশা-এই যাত্রা হোক আস্থার, হোক কল্যাণের। দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার ভারে ক্লান্ত জাতি এখন চায় স্বস্তি, চায় স্থিতি। গত দেড় বছরের দমবন্ধ বাস্তবতার পর প্রয়োজন একটি সুসংহত, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, যেখানে মানুষ নিশ্চিন্তে স্বপ্ন দেখতে পারে। এগিয়ে যেতে পারে।
ঈদ আমাদের শেখায় অন্তরের শুদ্ধতা, সহমর্মিতা ও ঐক্যের শক্তি। এই শিক্ষা যদি আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করতে পারি, তবে সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়ই হয়ে উঠবে আরো আলোকিত। ঈদ সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি।
সানা/আপ্র/১৯/৩/২০২৬