আজকের পৃথিবী এক অনিশ্চয়তার কিনারায় দাঁড়িয়ে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে পাল্টাপাল্টি হামলা, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, আবার মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে উত্তেজনা-সব মিলিয়ে বিশ্ব যেন অগ্নিগর্ভ। একেকটি অঞ্চলভিত্তিক সংঘাত ক্রমেই বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হবে। পাকিস্তান-আফগানিস্তান পরিস্থিতি তার সাম্প্রতিক উদাহরণ। বিমান হামলা, পাল্টা আক্রমণ, হতাহতের দাবি-এসবের মধ্যেই সাধারণ মানুষ আতঙ্কে রাত জাগছে। কাবুলের এক বাসিন্দার ভাষ্যে, বিস্ফোরণের শব্দে ঘর কেঁপে উঠেছে, শিশুরা ভয়ে কাঁপছে। যুদ্ধের কৌশলগত হিসাব-নিকাশের আড়ালে মানবিক বিপর্যয়ই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভেঙে পড়া, অর্থনীতির স্থবিরতা-এসবের দায় কে নেবে?
বিশ্বায়নের যুগে কোনো দেশ একা নয়। জ্বালানি, খাদ্যশস্য, প্রযুক্তি, বাণিজ্য-সবকিছুই পারস্পরিক নির্ভরতার জালে বাঁধা। এক অঞ্চলের যুদ্ধ অন্য অঞ্চলে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থার ভাঙন ডেকে আনে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দামে যে অভিঘাত সৃষ্টি করেছে, এর রেশ এখনো কাটেনি। নতুন করে বড় আকারের সংঘাত শুরু হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরেক দফা ধাক্কা সামলাতে পারবে কি?
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসঙ্গ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে সীমিত ক্ষমতার পারমাণবিক বোমা ব্যবহৃত হয়েছিল, আজকের অস্ত্রভাণ্ডার তার চেয়ে বহুগুণ বিধ্বংসী। পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আরো সংবেদনশীল করে তুলেছে।
যদি কখনো পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার ঘটে, তাহলে তা কেবল যুদ্ধরত দেশের জন্য নয়; পুরো মানবসভ্যতার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। পরিবেশ, কৃষি, জনস্বাস্থ্য-সবকিছুতে তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়বে। এ সংকটময় সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে সংযম ও সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। বিভিন্ন দেশ মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল করতে হলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর আন্তরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। শক্তি প্রদর্শনের বদলে আস্থা তৈরির পদক্ষেপই হতে পারে উত্তরণের পথ।
যুদ্ধকালিন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সব সময় সংযম দেখিয়ে এসেছে। নিরপেক্ষ থেকেছে; কিংবা স্পষ্ট অন্যায় ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান ব্যক্ত করেছে। এবারও কারো পক্ষ-বিপক্ষ নেয়নি। এটি আমাদের পররাষ্ট্রনীতির অংশ। কারো সাথে বৈরিতা নয়, সবার সাথে বন্ধুত্ব।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই শেষ হয়-কিন্তু ততক্ষণে অসংখ্য প্রাণ ঝরে যায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ক্ষত বয়ে বেড়ায়। তাই যুদ্ধ শুরুর আগেই শান্তির উদ্যোগ নেওয়াই মানবিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্রনেতাদের মনে রাখতে হবে, সামরিক জয় কখনো স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করে না; টেকসই সমাধান আসে সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায়ভিত্তিক সমঝোতার মাধ্যমে। আজ বিশ্বের প্রত্যাশা হলো-যুদ্ধ নয়, শান্তি। প্রতিশোধ নয়, প্রজ্ঞা। অস্ত্রের ঝনঝনানি নয়, কূটনীতির সেতুবন্ধন। মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই থামতে হবে, এখনই শান্তির পথে হাঁটতে হবে। এটি আমাদেরও প্রত্যাশা।
সানা/এসি/আপ্র/০১/০৩/২০২৬