বাবার হাত ধরে গুলিস্তানের ফুটপাতের জামা-কাপড় আর জুতার দোকানগুলোতে ঘুরছিল শিশু তাসমিয়া। বাবা কোনো কোনো দোকানে থেমে দরদাম করছিলেন।
অন্যদিকে থেমে থেমে বাবাকে জুতা কেনার বায়না করছিল মেয়ে। কিন্তু বাবা বলছিলেন পরে কেনার কথা। হাতে বেশ কয়েকটি ব্যাগ থাকা রাশেদ খান পেশায় গাড়িচালক।
একটি সংবাদসংস্থার সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে এই বাবা জানালেন, ঈদ উপলক্ষে পরিবারের সবার জন্যই কম-বেশি কেনাকাটা করেছেন; সঙ্গে থাকা মেয়ের জন্যও জামা কিনেছেন। কিন্তু ৬ বছর বয়সী তাসফিয়ার শুধু ওই জামাতে যেন বায়না মেটেনি। সে বলছিল, খালি একটা জামা কিন্না দিছে, আর কিছু দেয় নাই।
কথার মধ্যেই বাবা সন্তানকে আশ্বস্ত করছিলেন, ঈদের আরো কয়েকদিন বাকি আছে। পরে তাকে জুতা কিনে দিবেন। বাবার কথায় আশ্বস্ত হয়ে শিশু তাসমিয়া চুপ হয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু চোখেমুখে লেগে থাকা ঈদ কেনাকাটার ঝিলিকটা যেন কিছুটা কমে আসে।
মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা রাশেদ খান এক ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীর জন্য কেনাকাটা করেছেন গুলিস্তানের ফুটপাতে বসা দোকান থেকেই। সামর্থ্য অনুযায়ী ঈদ কেনাকাটার শেষ পর্যায়ে এসে তিনি বলেন, যেমন সামর্থ্য, তেমই কিনলাম। কম-বেশি সবার জন্যই কিনছি।
ঈদে পরিবার-পরিজনের এমন আব্দার আর সাধের সঙ্গে সাধ্যের সমন্বয় করতে রাশেদ খানের মতো মানুষজনের গন্তব্য এখন ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতের দোকান।
গত শুক্রবার (১৩ মার্চ) দুপুরের পর ঢাকার গুলিস্তানের প্রায় পুরোটাজুড়ে সড়কের দুই পাশে বসা দোকানগুলোতে ছিল উপচেপড়া ভিড়। ক্রেতাদের চাপ আর বিক্রেতাদের হাকডাকে সরগরম হয়ে ওঠে ফুটপাতের ঈদ কেনাকাটা। পরেরদিন শনিবারও দেখা গেছে একই রকম ভিড়।
সব বয়সীদের কথা মাথায় রেখে ঈদ প্রস্তুতি দেখা গেছে এখানকার দোকানগুলোতে। সকল বয়সী নারী-পুরুষের পোশাক, প্রসাধনী, জুতা, বেল্ট, ঘড়ি-সানগ্লাস, ব্যাগ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় প্রায় সবই মিলছে দু-চার কদম আগ-পিছ হলেই।
এদিন গুলিস্তান হল মার্কেটের মোড় থেকে গোলাপশাহ মাজার পর্যন্ত পুরো সড়ক ক্রেতা-বিক্রেতাদের দখলে ছিল। আশপাশের প্রায় সব সড়কের দুই পাশেও দেখা গেছে সারিবদ্ধ বিভিন্ন দোকান। কিছু দোকানে কাপড়-জুতা বিক্রি হতে দেখা গেছে একদরে, আর কিছু দোকানে চলছিল চিরায়ত দর কষাকষি। পছন্দ আর দামে মিললে ক্রেতারা বিভিন্ন দোকান ঘুরে চাহিদামতো কেনাকাটা করছিলেন। তবে বিক্রেতারা বলছেন, এখনো ‘ঠিকঠাক জমেনি’ তাদের বিক্রি।
ফুটপাতের দোকান আর এসব ঘিরে ক্রেতাদের ভিড়ে কোথাও যান চলাচলে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই কারো। কেউ চাহিদামতো কিনতে পারলে খুশি; আর কেউ বেঁচতে পারলে।
হল মার্কেটের সামনের ফুটপাতে ছেলেদের জিন্সের প্যান্ট বিক্রি করছিলেন জয় নামে একজন। তার ভাষ্য, তার দোকানে সর্বনিন্ম ৪০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকার প্যান্ট রয়েছে। এর বাইরে ‘যার থেকে যেমন রাখতে পারার’ কথা বললেন হাসতে হাসতে।
ঈদের বাজার কেমন জমেছে জানতে চাইলে এই বিক্রেতা বলেন, নাহ, বাজার ভালা না। এহন অনেক দোকান, সবখানে দোকান আছে। কাস্টমার আর আগের মতো নাই। ঈদ বাজার কওয়ার মতো কোনো ভাব দেখতাছি না। সামনে কেমন হইব আল্লাহ জানে। তার দোকানের লাগোয়া আরেকটি দোকান বসিয়ে শার্ট বিক্রি করছিলেন সেলিম। তিনি শার্টপ্রতি ২৫০ করে জোড়া ৫০০ হিসেবে একদামে বিক্রি করছিলেন।
এখনো ঠিকঠাক ঈদ বাজার ‘না জমলেও’ সামনের কয়েকদিন কেনাবেচা বাড়বে বলে আশা এ বিক্রেতার। তিনি বলেন, এইবার বুঝতাছি না। কাস্টমার আহে, ২৫০ টেকার শার্ট কয় ১০০ টেকা। ঈদ তো চইলা আইলো। দেখা যাক নসিবে কী আছে।
সেখানেই শিশুদের প্যান্ট বিক্রির একটি দোকানে ৯ বছর বয়সী ভাতিজার জন্য প্যান্ট দেখছিলেন ইমরান। সঙ্গে থাকা ভাতিজার মাপজোক করে একজোড়া প্যান্ট পছন্দও করেন। কিন্তু বিক্রেতা দুটি প্যান্টের দাম ৯০০ চাইতেই ইমরান ৪০০ টাকা দাম বলে ভাতিজাকে নিয়ে হাঁটা শুরু করেন। নাছোড়বান্দা বিক্রেতা আরো কয়েকদফা দাম কমালেও অনড় থাকেন ইমরান। দরকষাকষি চললেও কিছুক্ষণ পর ৪০০ টাকাতেই প্যান্টদুটি দিয়ে দেন বিক্রেতা।
স্থানীয় একটি দোকানের কর্মচারীর ইমরান প্যান্ট কেনার পর বলেন, আমাদের বাসা পুরান ঢাকাতেই। ছুটির দিন, ঈদও চলে আসছে। ভাতিজাকে নিয়া বের হইলাম কিছু কেনাকাটা করতে। ভাতিজার জন্য কেনা শেষ হইলে টুকটাক কিছু পছন্দ হইলে অন্যদের জন্যও কিনব।
শিশুদের জন্য জামা বিক্রি করছিলেন মনির। তার দোকানে জামার দাম ৬০ টাকা থেকে শুরু; আর সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। তিনি বলেন, কাস্টমার নাই। অন্য বছর এমন সময় মাল দিয়া কুলাইতে পারি না। এইবার সেই তুলনায় বেচাকেনা শুরুই হয় নাই।
বড়দের পলো শার্ট বিক্রেতা মো. সিফাত জানালেন, তার দোকানে বেশির ভাগ পলো শার্টের দামই ১৫০ টাকা। আর অল্প কিছু রয়েছে ৩০০ টাকার। তিনি দোকানে স্পিকার বাজিয়েও দাম শোনাচ্ছিলেন। বেচাকেনা কেমন জানতে চাইলে এই বিক্রেতা বলেন, চলতেছে মোটামুটি। ফুটপাতের বেচাবিক্রি ২৬-২৭ রোজার সময় ভরপুর হয়। দেখা যাক এইবার কী হয়, ইনশাল্লাহ বেচাবিক্রি বাড়ব।
পাশেই আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনের ফুটপাতেও বিভিন্ন দোকান দেখা গেছে, যেখানে শিশুদের জন্য জুতা নেড়েচেড়ে দেখছিলেন সোনিয়া। দুই বোন ও শিশু সন্তানসহ কেনাকাটা করতে এসেছেন এই গার্মেন্টকর্মী। তিনি বললেন, এহন যে দিনকাল, আর জিনিসপত্রের যে দাম, কোনো রকমে খাইয়া-পইরা বাঁচতেই জান বাইর হইয়া যায়। এরমধ্যে আমাগো আর ঈদ।
তারপরেও পরিবারের ছোটদের জন্য ও নিজের সন্তানের জন্য সাধ্যমতো কিছু কেনাকাটা করতেই হবে বলে আজ এসেছেন তিনি। তিনি বলেন, বাচ্চাটার জন্য একজোড়া জুতা পছন্দ করছি। দাম চায় ২৫০ টাকা। দেখি আরেকটু ঘুইরা, না হইলে যাওনের সময় নিয়া যামু। তার বোন রোকসানাও বোনের সঙ্গে একই কারখানায় কাজ করেন। তিনি বলেন, আগে পোলাপাইনের লাইগা কিনমু, তারপর বাপ-মার কিছু কিনমু। এরপরে সবকিছু মিলায়ে হইলে আমরা। না কিনলে অযথা দাঁড়িয়ে ভিড় বাড়িয়ে সময় নষ্ট করা পছন্দ করেন না এখানকার ফুটপাতের দোকানীরা। অন্যদিকে দামাদামি করে তুলনামূলক কম দামে প্রিয়জনের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনতে ঘুরতে থাকেন সোনিয়াদের মতো অনেকেই।
সানা/আপ্র/১৪/৩/২০২৬