একেএম ফজলুল হক: চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বৈধ পথে সোনার বার আসার পরিমাণে বড় ধস নেমেছে। এতে গত চার বছরে সরকারের সরাসরি রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। একসময় চট্টগ্রাম কাস্টমসের এ খাত থেকে বছরে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা রাজস্ব এলেও এখন তা নেমে এসেছে ১০০ কোটির ঘরে। শুল্ক বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির যে পরিকল্পনা নিয়েছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাস্তবে তার উল্টো ফল হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় রোধ, চোরাচালান ও অর্থ পাচার বন্ধ, প্রবাসীদের বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করা এবং বৈধ বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে সোনা আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো ও বিধিনিষেধ কঠোর করে এনবিআর। কিন্তু এসব পদক্ষেপের পর থেকেই বৈধ পথে সোনার বার আনার প্রবণতা কমতে থাকে।
জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাগেজ বিধিমালা অনুযায়ী একজন যাত্রী ভরিপ্রতি ২ হাজার টাকা শুল্ক দিয়ে সর্বোচ্চ দুটি সোনার বার, অর্থাৎ ২৩৪ গ্রাম সোনা আনতে পারতেন। ২০২৩ সালের জুনে এই শুল্ক দ্বিগুণ করে ভরিপ্রতি ৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরে ব্যাগেজ বিধিমালা সংশোধন করে একজন যাত্রীর বছরে সর্বোচ্চ দুটি বার বা ২০ ভরি সোনা আনার সুবিধা কমিয়ে মাত্র একটি বার বা ১০ ভরি (১১৭ গ্রাম) করা হয়। এতে একটি সোনার বার বৈধভাবে আনতে প্রায় ৪২ হাজার টাকা শুল্ক দিতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, শুল্ক বাড়ানো ও বিধিনিষেধ আরোপের ফলে বৈধ পথে সোনা আনা কার্যত কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল, সোনা কেনায় প্রবাসীদের অর্থ ব্যয় নিরুৎসাহিত করে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়ানো, ডলার সংকট মোকাবিলা, বৈধ বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের সুরক্ষা দেওয়া এবং হুন্ডি সিন্ডিকেটের অর্থ পাচার ও ভারতে সোনা চোরাচালানের ট্রানজিট রুট ব্যবহার বন্ধ করা। কিন্তু বৈধ আমদানি কমলেও অবৈধ পথে সোনা আসা বন্ধ হয়নি।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিয়ম সহজ থাকার সময় ২০২২-২৩ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে বৈধভাবে ১ লাখ ৭২ হাজার ৫১৪টি সোনার বার দেশে আসে। এসব বারের মোট ওজন ছিল প্রায় ২ হাজার ১২২ কেজি বা ২ টন। বর্তমান বাজারমূল্যে এর দাম প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। প্রতিটি বার ১০ ভরি হিসাবে ওই অর্থবছরে মোট সোনা আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ লাখ ২৫ হাজার ১৪০ ভরি।
২০২৩ সালের বাজেটে শুল্ক দ্বিগুণ করার পরই চিত্র পাল্টে যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যাত্রীরা বৈধভাবে আনেন মাত্র ২৭ হাজার ৫৪৬টি সোনার বার। এগুলোর মোট ওজন ছিল ৩ হাজার ২১২ কেজি এবং বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। এ খাত থেকে কাস্টমস রাজস্ব পায় ১০৮ কোটি টাকা।
পরের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে বারের সংখ্যা আরো কমে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৫৬৭টিতে। মোট ওজন ছিল ২ হাজার ৫১৫ কেজি। এসব বার থেকে রাজস্ব আসে ১০১ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে আসে ২১ হাজার ৪৩৯টি বার, যার ওজন ২ হাজার ৫০৯ কেজি। এ খাত থেকে কাস্টমসের রাজস্ব আয় হয় ১০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুল্ক বাড়ানোর পর বৈধ পথে সোনার বার আমদানি কমার পাশাপাশি রাজস্ব আয়ও বছরে প্রায় ১০১ থেকে ১০৮ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক প্রণব সাহা বলেন, শুল্ক বাড়িয়ে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়েনি, বরং কমেছে। তাহলে এই নীতিতে কার লাভ হলো? আগের শুল্কে ফিরে গিয়ে নীতি সহজ করা উচিত। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব পাবে। একই সঙ্গে চোরাচালান বন্ধে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
চোরাচালান কমেনি, বেড়েছে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ: শুল্ক ও বিধিনিষেধ কঠোর করার পর অবৈধ পথে সোনা আসা কমেছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। কাস্টমসের হিসাবে, ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ - এই চার অর্থবছরে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের কাছ থেকে মোট ১ হাজার ১১১টি অবৈধ সোনার বার আটক করা হয়েছে। এসব বারের ওজন ১২৯ কেজি।
এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৪৫৮টি বার জব্দ হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২০৫টি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২১১টি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৩৭টি বার আটক করা হয়। দেশের বাজারে প্রতি ভরি সোনার গড় দাম ২ লাখ ২০ হাজার টাকা হিসাবে জব্দ করা এসব বারের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বৈধ পথে সোনা আনার সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় সরকার রাজস্ব হারালেও লাভবান হয়েছে আন্তর্জাতিক চোরাচালান সিন্ডিকেট ও হুন্ডি কারবারিরা। আগে প্রবাসীরা পরিবার কিংবা পরিচিত জুয়েলার্সের জন্য শুল্ক দিয়ে বৈধভাবে সোনা এনে কিছুটা লাভ করতে পারতেন। কিন্তু ভরিপ্রতি শুল্ক ৫ হাজার টাকা হওয়ায় বৈধভাবে সোনা আনা অলাভজনক হয়ে পড়ে। এই সুযোগ কাজে লাগায় মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক পাচারকারী চক্র।
তাঁদের দাবি, প্রতিটি বারে প্রায় ৫০ হাজার টাকা এবং প্রতি কেজিতে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা স্থানীয় হুন্ডি কারবারিরা সংগ্রহ করে দুবাই থেকে সোনা কেনে। পরে চোরাই পথে দেশে এনে হুন্ডি চক্র ও পাচারকারীরা শতকোটি টাকার মুনাফা করছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সহকারী কমিশনারও তল্লাশির সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সব যাত্রীকে শতভাগ স্ক্যান বা তল্লাশি করা সম্ভব হয় না। সন্দেহ হলে কিংবা গোপন তথ্য থাকলেই কেবল যাত্রীকে থামানো হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক যাত্রী স্ক্যানিংয়ের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। তাঁদের কেউ সোনা বহন করছেন না, এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার সুযোগ নেই।
সানা/আপ্র/৮/১১/২০২৬