স্থানীয় সরকারের ৬ হাজার ৫৪৪টি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য মোট ৩৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন দপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের দপ্তর, পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল এবং দেশের বিভিন্ন হাট-বাজার ও প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রসহ মোট ৬ হাজার ৫৪৪টি প্রতিষ্ঠানে ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হবে।
তিনি জানান, এ জন্য বিশেষ বরাদ্দ থেকে অর্থ ছাড় করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা চিঠি দিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী ২৭ জানুয়ারির মধ্যে কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মীর শাহে আলম বলেন, প্রাথমিকভাবে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। তবে বরাদ্দের অর্থের সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব রাজস্ব যোগ করে দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে মোট প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রয়োজনের ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে। অতিরিক্ত ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্যাকেজের আওতায় নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। এ বিদ্যুৎ ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিক্রি করার সুযোগ থাকবে।
প্রতিমন্ত্রীর দাবি, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করে পাওয়া অর্থে সরকারের দেওয়া অর্থ ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে উঠে আসবে। এরপর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত রাজস্ব আয় বাড়বে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহে স্বাচ্ছন্দ্য আসবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হবে।
তিনি জানান, সোলার প্যানেল স্থাপনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে ৫ দশমিক ৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একটি মানসম্মত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষমতার সৌর প্যানেল স্থাপনে খরচ হবে প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার টাকা।
এ হিসাব অনুযায়ী দেশের ইউনিয়ন পরিষদ ভবনগুলোতে সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য অর্থ ছাড় করা হয়েছে। সারাদেশে ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ হাজার।
হাট-বাজারের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থ থেকেও ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের আলাদা চিঠি দিয়ে হাট-বাজারের উন্নয়ন বরাদ্দ ব্যবহার করে হাটের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির নীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিভাগের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে ওয়ালটন, প্রাণ-আরএফএল, গ্রামীণ শক্তিসহ বিদ্যুৎ বিভাগে তালিকাভুক্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নীতিমালা অনুযায়ী ২০ বছরের চুক্তি করবে। ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে করা ওই চুক্তির আওতায় সৌর প্যানেল স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ২০ বছর বিনা মূল্যে সেবা বা ওয়ারেন্টি দেবে।
তিনি জানান, এ চুক্তির ফলে ২০ বছর পর্যন্ত সৌর প্যানেলের সেবা ও রক্ষণাবেক্ষণের নিশ্চয়তা থাকবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে এবং কোনো সমস্যা হলে তা মেরামত করবে।
মীর শাহে আলম জানান, সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্যাকেজ অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে তা বিক্রির সুবিধা নিতে চায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বায়ত্তশাসিত এবং তাদের নিজস্ব রাজস্ব আয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। খেয়াঘাট, হাট-বাজার, পরিবহন, বাণিজ্যিক লাইসেন্স ও হোল্ডিংসহ বিভিন্ন খাত থেকে তারা রাজস্ব আদায় করে। এর সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রির মাধ্যমে নতুন একটি রাজস্ব উৎস তৈরি হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করতে পারবে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব আয়ও বাড়বে।
তিনি আবারো জানান, ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করা গেলে ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে ব্যয়কৃত অর্থ উঠে আসবে। এরপর ২০ বছর পর্যন্ত সেবা ও ওয়ারেন্টির সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মীর শাহে আলম জানান, প্রায় ৩ হাজার ইউনিয়ন পরিষদের জন্য ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। ৫ দশমিক ৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার টাকা ব্যয় হলেও মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর কাটার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বেশি অর্থ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদগুলোর নিজস্ব রাজস্ব থেকেও সৌর প্যানেল স্থাপনে অর্থ ব্যয় করতে বলা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদগুলো হাট-বাজার থেকে ৫ শতাংশ এবং ভূমি রেজিস্ট্রেশন থেকে ১ শতাংশ রাজস্ব পায়। এ অর্থের সঙ্গে সরকারি বরাদ্দ যোগ করে দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, সিটি করপোরেশনগুলোকে ৭৫ কোটি টাকা, উপজেলা পরিষদকে ৯৯ কোটি টাকা, পৌরসভাকে ৬৪ কোটি টাকা এবং জেলা পরিষদকে ১২ কোটির কিছু বেশি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও জেলা পরিষদ—এই পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য মোট ৩৭০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে।
এসি/আপ্র/২৩/৯/২০২৬