দেশের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় থাকা ১১৭টি ওষুধের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি। উৎপাদন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে এসব ওষুধের দাম সমন্বয় না হওয়ায় উৎপাদন করে লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
এর ফলে তালিকাভুক্ত অনেক ওষুধ বাজারে সহজলভ্য না থাকায় রোগীদের তুলনামূলক বেশি দামের বিকল্প ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে।
গত সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির কার্যালয়ে ‘ওষুধ শিল্পের অগ্রগতি: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় সংগঠনটির নেতারা এসব তথ্য তুলে ধরেন। সভায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ, মূল্য নির্ধারণের নীতিমালা সংস্কার এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়।
সমিতির নেতারা বলেন, বর্তমানে ১৯৯৪ সালের মূল্য নির্ধারণ কাঠামোর ভিত্তিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। গত ৩২ বছরে এসব ওষুধের দাম মাত্র দুবার সমন্বয় করা হয়েছে। অথচ বছরে গড়ে ৮ শতাংশ হারে মূল্য সমন্বয়ের কথা ছিল।
তাঁদের দাবি, এই দীর্ঘ সময়ে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, শ্রমিকের মজুরি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দামসহ প্রায় সব উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে ওষুধের দাম বাড়ানো হয়নি। ফলে অনেক অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন আর্থিকভাবে টেকসই থাকছে না।
সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ১৯৯৪ সালের ওষুধ নীতি দেশের ওষুধ শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ওই সময় ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করা হয়। এর মধ্যে ১৯টি ওষুধ উৎপাদনের জন্য নিবন্ধিত হয়নি। ফলে ৯৮টি ওষুধের প্রাপ্যতা ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে এসব ওষুধের অনেকগুলোর উৎপাদন খরচ বিক্রয়মূল্য থেকে উঠে আসে না। দাম সমন্বয় না হওয়ায় প্রায় ৬০ শতাংশ ওষুধের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
সমিতির সাবেক মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. জাকির হোসেন বলেন, শুধু মূল্য নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিকোণ থেকে ওষুধ শিল্পকে বিবেচনা করলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ও নতুন বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাঁর মতে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদে শিল্প মালিকদের আপত্তি নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। একই সঙ্গে ওষুধের দাম নির্ধারণে স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত ও নিয়মিত সমন্বয়যোগ্য ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
প্রয়োজনীয় ওষুধ সুলভ মূল্যে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার চাইলে ভর্তুকি অথবা সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার মাধ্যমে কম দামে এসব ওষুধ সরবরাহ করতে পারে। তবে কোনো ধরনের ভর্তুকি ছাড়া বেসরকারি উৎপাদনকারীদের দীর্ঘদিন কম দামে ওষুধ উৎপাদনের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে বেসরকারি ওষুধ কোম্পানির সরাসরি তুলনাও যৌক্তিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির নির্দিষ্ট সরকারি ক্রয়াদেশ ও নিশ্চিত বাজার রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো বিপণন ব্যয়ের চাপও তাদের বহন করতে হয় না।
সরকার চাইলে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন করে সরকারি হাসপাতালের রোগীদের বিনা মূল্যে অথবা কম দামে সরবরাহ করতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সংকট ওষুধ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে জানান সমিতির মহাসচিব মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান।
তিনি বলেন, কর্মঘণ্টার বড় একটি অংশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কারখানাগুলোকে জেনারেটর, বড় ইউপিএস ও বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
ওষুধ উৎপাদনের প্রক্রিয়া একবার শুরু হলে মাঝপথে বন্ধ করা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে কারখানাগুলোতে জেনারেটর ও বড় ইউপিএসের ব্যাকআপ রাখতে হয়।
গ্যাসের সংকটে জেনারেটর চালাতেও ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত ডিজেল মজুতের সক্ষমতা না থাকায় মজুত শেষ হয়ে গেলে দ্রুত বাজার থেকে ডিজেল সংগ্রহ করতে হয়, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়।
সভায় ওষুধ শিল্পের নেতারা বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছ, টেকসই ও সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ অব্যাহত থাকলে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান তাঁরা।
সানা/আপ্র/২৬/৮/২০২৬