রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে সামনে রেখে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। সীমান্ত হাট পুনরায় চালু, স্থলবন্দরগুলো পুরোপুরি সচল করা এবং স্থলপথে সুতা আমদানির ওপর বিদ্যমান বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার মতো বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর স্থগিত হওয়ায় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হলেও বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথ খোলা রাখার চেষ্টা চলছে। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাম্প্রতিক আলোচনা থেকে অন্তত এমন ইঙ্গিতই মিলছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) ঢাকায় বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর উপায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে থাকা বিভিন্ন বাধা দূর করার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে গত দেড় বছরে কিছু বাধা তৈরি হওয়ায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমের গতি কমেছে।
সীমান্ত হাট ফের চালুর উদ্যোগ
বৈঠকে বন্ধ হয়ে যাওয়া সীমান্ত হাটগুলো পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি স্থলবন্দরগুলোকে পুরোপুরি কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সীমান্ত হাট চালু হলে সীমান্তবর্তী এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সরাসরি বাণিজ্যের সুযোগ বাড়বে। অন্যদিকে স্থলবন্দর পুরোপুরি সচল হলে দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন আরও গতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া স্থলপথে ভারত থেকে সুতা আমদানির ওপর থাকা বর্তমান বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
ব্যবসায়ীদের যৌথ উদ্যোগের প্রস্তাব
দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নও এই উদ্যোগের আওতায় গুরুত্ব পেতে পারে।
বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর মতে, এসব উদ্যোগের লক্ষ্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে আবারও গতি ফিরিয়ে আনা।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
‘দুই দেশই সমান’
বৈঠকে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। তবে দুই দেশের সাধারণ মানুষ উন্নয়ন ও অগ্রগতি চান।
তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতকে একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতার বিষয়টি তুলে ধরে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। কোনো দেশ বড় বা ছোট নয়; দুই দেশই সমান। সমতার ভিত্তিতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর তিনি জোর দেন।
যৌথ বিনিয়োগ ও উৎপাদনে গুরুত্ব
দীনেশ ত্রিবেদীর মতে, দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী হলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এ ক্ষেত্রে যৌথ বিনিয়োগ ও যৌথ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক সাফল্যের কথাও উল্লেখ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার।
তাঁর মতে, দুই দেশের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে যৌথ বিনিয়োগ ও উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা গেলে শুধু বাণিজ্যই বাড়বে না, দুই দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতির মধ্যকার পারস্পরিক নির্ভরশীলতাও গভীর হবে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্বস্তির মধ্যেও বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সীমান্ত যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক সহযোগিতার মতো বাস্তব ক্ষেত্রগুলোতে আলোচনা অব্যাহত থাকাকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সানা/আপ্র/২৬/৮/২০২৬