‘আমি গরিব হলে কী হবে, তোকে তো সোনা দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছি। কোনো দিন ফুলের টোকাও লাগতে দিইনি। বুকের ভেতর আগলে রেখেছিলাম। তোকে কীভাবে কষ্ট দিয়ে মারলো তারা।’
মেয়ের নিথর দেহ অ্যাম্বুলেন্সে। বাইরে দাঁড়িয়ে বুক চাপড়ে বিলাপ করছিলেন বাবা তেজেন্দ্র দাশ। কখনো অ্যাম্বুলেন্সের জানালা দিয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন, কখনো স্বজনদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন। পাশে মা আলো বালা দাশের কান্নাও থামছিল না। মা-বাবার আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থানার পরিবেশ।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকালে থানার প্রাঙ্গণে দেখা যায় এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য। নিহত তরুণীর নাম চন্দনা রানী শীল (২২)। তিনি সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ-পশ্চিম সৈয়দপুর এলাকার বাসিন্দা তেজেন্দ্র দাশের মেয়ে।
শুক্রবার সকালে উপজেলার বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের টেরিয়াইল এলাকায় টেরিয়াইল উচ্চবিদ্যালয়ের পেছন থেকে চন্দনার হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মরদেহের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তা দেখে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে শনাক্ত করেন। এরপর থানায় গিয়ে মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন মা-বাবা।
চন্দনার পরিবারের অভিযোগ, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের পর তাঁকে হত্যা করেছেন তাঁর স্বামী। এ ঘটনায় চন্দনার স্বামী শিমুল শীলসহ তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডের কারণ এবং কারা এতে জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রেমের বিয়ে, নির্যাতনের অভিযোগ
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে সীতাকুণ্ডের কুমিরা ইউনিয়নের বড় কুমিরা এলাকার বাসিন্দা শিমুল শীলের সঙ্গে চন্দনার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে তাঁরা বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকে যৌতুকের দাবিতে চন্দনাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ তাঁর পরিবারের সদস্যদের।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ঘটনার আগের দিনও নির্যাতনের শিকার হয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন চন্দনা। পরে তাঁর স্বামী তাঁকে আবার ডেকে নিয়ে যান। এর এক দিন পরই পরিবারের সদস্যরা তাঁর মৃত্যুর খবর পান।
অন্য কোথাও হত্যার পর মরদেহ ফেলার সন্দেহ
সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীর বলেন, শুক্রবার সকালে টেরিয়াইল উচ্চবিদ্যালয়ের পেছনে এক নারীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
তিনি জানান, ধারণা করা হচ্ছে, ওই নারীকে অন্য কোথাও হত্যার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বিদ্যালয় এলাকার একটি জমিতে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছিল। মরদেহ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
একদিকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তরুণীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা, অন্যদিকে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ - সব মিলিয়ে চন্দনার মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত চলছে। তবে অভিযোগের সত্যতা, হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত এবং কী কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
মেয়েকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়া মা-বাবার বিলাপের মধ্যে এখন একটাই প্রশ্ন-যে মেয়েকে তাঁরা আগলে রেখেছিলেন, তাঁর এমন করুণ পরিণতি কেন হলো? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন স্বজনেরা; আর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।
সানা/আপ্র/১০/১০/২০২৬