বরিশাল নগরের প্যারারা রোডে দৈনিক সমকাল-এর আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাবেক ব্যুরোপ্রধান পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাতটার দিকে ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত কার্যালয় থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি চিরকূট উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ‘সুইসাইড নোট’ শিরোনামে লেখা। সেখানে নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করেননি পুলক। অন্য চিরকূটগুলো স্ত্রী, মেয়ে, ভাই, সহকর্মী ও পরিচিতজনদের উদ্দেশে লেখা বলে জানা গেছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পুলক চ্যাটার্জি আত্মহত্যা করেছেন। তবে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থলে অপরাধ তদন্ত বিভাগের একটি দলও কাজ করেছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
বরিশাল মহানগর পুলিশের কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ রাত নয়টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ঘটনাস্থল থেকে কয়েক পাতার চিরকূট উদ্ধার করা হয়েছে। পুলক চ্যাটার্জির লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা বলে মনে হলেও পুলিশ সবকিছু যাচাই-বাছাই করছে। ময়নাতদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ৫৭ বছর বয়সী পুলক চ্যাটার্জি একসময় দৈনিক সমকাল-এর বরিশাল ব্যুরোপ্রধান ছিলেন। ২০২৩ সালের দিকে তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি বেকার ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, চাকরি হারানোর পর তিনি হতাশায় ভুগছিলেন। তবে এ কারণে তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন, এমনটা পরিবারের কেউ ভাবেননি। স্ত্রী নীলোৎপলা মুখার্জি ও এক মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার ছিল।
শুক্রবার বেলা তিনটার দিকে নগরের শ্রীনাথ চ্যাটার্জী লেনের বাড়ি থেকে বের হন পুলক চ্যাটার্জি। এরপর তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁর স্ত্রী নীলোৎপলা মুখার্জি সমকাল-এর বর্তমান বরিশাল ব্যুরোপ্রধান সুমন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
সুমন চৌধুরী পরে কার্যালয়ে এসে দেখেন, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজার ফাঁক দিয়ে তিনি পুলক চ্যাটার্জিকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। এরপর অন্য সংবাদমাধ্যমের সহকর্মী ও পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা ভেঙে তাঁর লাশ উদ্ধার করে।
সমকাল-এর বর্তমান ব্যুরোপ্রধান সুমন চৌধুরীর ভাষ্য, সাবেক ব্যুরোপ্রধান ও জ্যেষ্ঠ সংবাদকর্মী হিসেবে পুলক চ্যাটার্জির অনুরোধে তাঁকে কার্যালয়ে ঢোকার একটি চাবি দেওয়া হয়েছিল। তিনি মাঝেমধ্যে কার্যালয়ে এসে বসতেন এবং পত্রিকা পড়তেন। শুক্রবার ওই চাবি ব্যবহার করেই তিনি কার্যালয়ে ঢুকেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার সময় কার্যালয়ের পিয়ন দীপক ছুটিতে ছিলেন।
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার পাঁচটি চিরকূটের হাতের লেখা পুলক চ্যাটার্জির বলে জানিয়েছেন তাঁর ছোট ভাই ভূমি কর্মকর্তা দীপক কুমার চ্যাটার্জি। প্রত্যেক চিরকূটের নিচে পুলক চ্যাটার্জির স্বাক্ষর ও তারিখ রয়েছে।
একটি চিরকূটে নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করেননি তিনি। ওই চিরকূটে নিজের শারীরিক অসুস্থতা এবং ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন। আরেকটি চিরকূট লেখা হয়েছে বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেনকে উদ্দেশ করে। সেখানে প্রশাসনিক হয়রানি ছাড়া তাঁর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর এবং ময়নাতদন্ত না করার অনুরোধ করা হয়েছে।
আরেকটি চিরকূটে মেয়েকে পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যেতে বলেছেন পুলক। সাবেক সহকর্মী ও বর্তমান ব্যুরোপ্রধান সুমন চৌধুরীকে উদ্দেশ করে লেখা চিরকূটে সমকাল-এর কাছে তাঁর পাওনা টাকা আদায় করে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সুমন চৌধুরী বলেন, সমকাল-এর কাছে পুলক চ্যাটার্জির কত টাকা পাওনা রয়েছে, তা তাঁর জানা নেই।
পুলক চ্যাটার্জি বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি বরিশালের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর মৃত্যুতে বরিশালের সাংবাদিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন বলেন, পুলক চ্যাটার্জি শুধু সাংবাদিকতায় নয়, বরিশালের প্রতিটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও অগ্রভাগে ছিলেন। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা অপূরণীয়।
জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি শাহ সাজেদা বলেন, অত্যন্ত হাসিখুশি ও প্রাণবন্ত পুলক চ্যাটার্জি ছিলেন বরিশালের সাংবাদিকতা অঙ্গনের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তাঁর এভাবে অকালে চলে যাওয়া মেনে নেওয়া কঠিন।
পুলিশ বলছে, উদ্ধার হওয়া চিরকূট, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় যাচাই করে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা হবে। ফলে পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর ঘটনায় প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার ধারণা সামনে এলেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সানা/আপ্র/১২/৯/২০২৬