রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বসছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) শুরু হয়ে দুই দিনের এই সম্মেলন শেষ হবে ১৩ সেপ্টেম্বর। সম্মেলনকে ঘিরে ইতিমধ্যে নয়াদিল্লিতে জড়ো হয়েছেন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এরই মধ্যে ভারতে পৌঁছেছেন। ছয় বছর পর ভারত সফরে এসেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ ব্রিকসের অন্য সদস্য দেশগুলোর নেতারাও সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এবারের সম্মেলনে ১১ সদস্যের জোটের নেতারা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সংকট, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা, উদ্ভাবন ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করবেন। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এবারের সম্মেলনের রাজনৈতিক গুরুত্বও অনেক বেশি। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও কীভাবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো যায় এবং বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থায় ব্রিকসের ভূমিকা কতটা জোরদার করা যায়, সেদিকে নজর থাকবে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করবেন। পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
পুতিনের ভারত সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত থাকলেও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ও জ্বালানি সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদার করার পাশাপাশি যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
ছয় বছর পর ভারতে শি জিনপিং: ব্রিকস সম্মেলন ঘিরে সবচেয়ে বেশি নজর রয়েছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের দিকে। ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকার সীমান্ত সংঘর্ষের পর দীর্ঘ সময় ধরে ভারত-চীন সম্পর্কের টানাপড়েন চলেছে। ওই সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। চীনের পক্ষ থেকে হতাহতের যে সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। বিমান যোগাযোগ ও ভিসা ব্যবস্থা পুনরায় চালু হওয়ার পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগও বাড়ছে। ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরো স্বাভাবিক করার বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন শুধু দুই দেশের জন্য নয়, এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দুই দেশই বিশ্বের বড় অর্থনীতি এবং ব্রিকসের অন্যতম প্রধান সদস্য।
কী এই ব্রিকস: ব্রিকস ২০০৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। শুরুতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে গঠিত এই জোটে পরে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হয়। এরপর জোটের পরিধি আরো বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে সদস্যসংখ্যা ১১। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরব জোটটির সদস্য।
উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তাদের প্রতিনিধিত্ব ও প্রভাব জোরদার করাই ব্রিকসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সময়ের সঙ্গে এটি শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার জোট না থেকে বৈশ্বিক রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
সম্মেলনে কী আলোচনা হবে: ভারতের সভাপতিত্বে এবারের সম্মেলনের মূল আলোচনায় থাকবে ব্রিকসের অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলোতে সহযোগিতা বাড়ানো। এর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর মতবিনিময় হবে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সরবরাহব্যবস্থা, উদ্ভাবন ও নতুন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ব্রিকসের বিভিন্ন দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক যোগাযোগ আরো শক্তিশালী করার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
এবারের সম্মেলনে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি অংশীদার দেশ ও আমন্ত্রিত প্রতিনিধিরাও অংশ নিচ্ছেন। ভারতের ২০২৬ সালের সভাপতিত্বে জোটের সহযোগিতার ক্ষেত্র আরো বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দুই যুদ্ধের ছায়া: ব্রিকস সম্মেলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে বিশ্বের দুটি বড় সংঘাত। একদিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যেও সংঘাত ও উত্তেজনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর এসব সংঘাত নিয়ে অবস্থান এক নয়। ফলে সম্মেলনে অভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ও গুরুত্ব পাবে।
বিশেষ করে রাশিয়া ও ইরানের মতো যুদ্ধ ও সংঘাতকবলিত দেশের নেতাদের উপস্থিতি এবং চীন-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ এবারের সম্মেলনকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। ফলে দিল্লির বৈঠকগুলো থেকে কোনো যৌথ রাজনৈতিক বার্তা আসে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।
দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তা: বিশ্বনেতাদের উপস্থিতি ঘিরে নয়াদিল্লিতে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা। প্রায় ১৫ হাজার দিল্লি পুলিশ সদস্য এবং আধাসামরিক বাহিনীর ২০০ কোম্পানি মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ৫০০টির বেশি নজরদারি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে দিন-রাত নজরদারি চালানো হবে।
সম্মেলনের মূল আয়োজন হবে নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে। বিমানবন্দর, বিশ্বনেতাদের থাকার হোটেল, সম্মেলনস্থল এবং তাঁদের চলাচলের নির্ধারিত পথগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের চলাচলের সময় বিভিন্ন সড়কে সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ, ঘুরিয়ে দেওয়া বা অন্যান্য বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যতটা সম্ভব কম রাখার কথা জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
সব মিলিয়ে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলন শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি বৈঠক নয়, বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় উদীয়মান শক্তিগুলোর অবস্থান বোঝারও গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ভারত-চীন সম্পর্কের নতুন সমীকরণ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিল্লির এই সম্মেলন থেকে কী বার্তা আসে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে বিশ্ব। সূত্র: এনডিটিভি
সানা/আপ্র/১২/৯/২০২৬