জটিল হৃদরোগের চিকিৎসায় চট্টগ্রামের সক্ষমতা বাড়ছে। আধুনিক ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসাপদ্ধতির ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি এ অঞ্চলে পিটিসিএসহ বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগের চিকিৎসাও বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে চট্টগ্রাম অঞ্চলের আটটি কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬২০টি পিটিসিএ (এনজিওপ্লাস্টি/স্টেন্টিং) হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশের বেশি। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের কার্ডিয়াক ইন্টারভেনশনাল কেস বেড়েছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামের সিএসসিআর ক্যাথল্যাব ও রেডিসন ব্লু চট্টগ্রামে আয়োজিত দিনব্যাপী বৈজ্ঞানিক সম্মেলন ও প্রশিক্ষণে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। চট্টগ্রাম সোসাইটি অব ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি (সিএসআইসি) ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব কার্ডিওভাসকুলার ইন্টারভেনশন (বিএসসিআই) যৌথভাবে ‘সিএমই অন কার্ডিয়াক ইন্টারভেনশন’ শীর্ষক এ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে বৈজ্ঞানিক অংশীদার ছিল অ্যাবট ভাস্কুলার।
সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলের আটটি কেন্দ্রে মোট ১৭ হাজার ২০টি কার্ডিয়াক ইন্টারভেনশনাল কেস এবং ৪ হাজার ৯৪৪টি পিটিসিএ হয়েছিল। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিভিন্ন ধরনের কেস হয়েছে ১২ হাজার ১টি। এর মধ্যে পিটিসিএ হয়েছে ৩ হাজার ৬২০টি।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে সরকারি পর্যায়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭৮৬টি পিটিসিএ হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে সিএসসিআরে ৬৭১টি, ম্যাক্স হাসপাতালে ৬৩৭টি, চিটাগাং মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ৫৪৩টি এবং পার্কভিউ হাসপাতালে ৪৭৯টি পিটিসিএ হয়েছে।
চিকিৎসকেরা বলেন, চিকিৎসার সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় চিকিৎসকদের দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। এ লক্ষ্যেই সম্মেলনে তরুণ ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্টদের জটিল রোগীর চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ, কেস উপস্থাপন এবং সর্বশেষ চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।
সম্মেলনের প্রথম পর্বে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সিএসসিআর ক্যাথল্যাবে জটিল হৃদরোগীর করোনারি ইন্টারভেনশনের লাইভ কেস ডেমোনস্ট্রেশন করা হয়। সম্মেলনস্থল ও ক্যাথল্যাব থেকে চিকিৎসকেরা রোগী মূল্যায়ন, চিকিৎসাপদ্ধতি নির্বাচন, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং স্টেন্ট স্থাপনের বিভিন্ন কৌশল সরাসরি দেখার সুযোগ পান।
সিএসআইসির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামে হৃদরোগের বিভিন্ন ধরনের ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা বাড়ছে। স্থানীয় চিকিৎসকদের আরো দক্ষ করে তুলতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, রোগীর তথ্যভিত্তিক রেজিস্ট্রি এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের মেন্টর হিসেবে যুক্ত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামে মোট কেস বাড়লেও কিছু জটিল চিকিৎসা ও রুটিন পিটিসিএতে আরো দক্ষতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। তরুণ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ সক্ষমতা আরো বাড়ানো সম্ভব।
বিএসসিআইয়ের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. খালেকুজ্জামান চিকিৎসায় প্রযুক্তির পাশাপাশি সততা ও নৈতিকতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রোগীর জন্য কতটি স্টেন্ট প্রয়োজন বা আদৌ প্রয়োজন কি না, সে সিদ্ধান্তে চিকিৎসকের সততা ও নৈতিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কতটি স্টেন্ট বসানো হলো, তার চেয়ে চিকিৎসার মান এবং কোথায় থামতে হবে, তা জানা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জ্যেষ্ঠ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কায়সার নসরুল্লাহ খান বলেন, তরুণ চিকিৎসকদের কাজ শেখানোই এ ধরনের আয়োজনের অন্যতম বড় সার্থকতা। অর্জিত জ্ঞান তারা রোগীর চিকিৎসায় প্রয়োগ করলে এর সুফল দীর্ঘমেয়াদে রোগীদের কাছে পৌঁছাবে।
সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বে উদীয়মান ইন্টারভেনশনিস্টদের পরিচালিত বিভিন্ন জটিল কেসের অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা করা হয়। পাশাপাশি হৃদরোগ চিকিৎসার সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রটোকল ও জটিল পিসিআই কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন বিশেষজ্ঞরা।
ডা. কাজী শামীম আল মামুন, ডা. মুহাম্মদ খোরশেদ আলম ও ডা. উম্মেল কুলসুমা নিপার সঞ্চালনায় সেমিনারে প্যানেলিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ডা. আবু তারেক ইকবাল, অধ্যাপক ডা. শেখ হাসান মামুন, অধ্যাপক ডা. এম এ রউফ, ডা. এওয়াইএম নুরুদ্দীন জাহাঙ্গীর ও ডা. বিপ্লব ভট্টাচার্য।
ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকার কন্টিনেন্টাল হাসপাতালের সিনিয়র ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডা. কায়সার নসরুল্লাহ খান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. নুরুদ্দীন তারেক এবং ডা. আনিসুল আউয়াল।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বিএসসিআইয়ের কোষাধ্যক্ষ ডা. আবুল খায়ের। সিএসআইসির সাধারণ সম্পাদক ডা. আনিসুল আউয়ালের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা এতে উপস্থিত ছিলেন। ডা. সাইফ উদ্দিন অতিথিদের বরণ করে নেন।
সিএসআইসির যুগ্ম সম্পাদক ডা. এস এম ইফতেখারুল ইসলাম ধন্যবাদ বক্তব্য দেন। পরে সভার সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরীর সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।
সানা/আপ্র/১২/৯/২০২৬