আব্দুস সাত্তার সুমন
চালের বস্তা পানিতে তলিয়ে গেল। গরুটি গোয়াল ভেঙে স্রোতে ভেসে যেতে লাগল। রাশেদ প্রাণপণ চেষ্টা করে দড়ি ধরে তাকে টেনে আনল।
রাত তখন প্রায় দুইটা। আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানি, চারদিকে বজ্রের গর্জন। হঠাৎ গ্রামের মসজিদের মাইক থেকে ভেসে এলো, যারা নিচু এলাকায় আছেন, সবাই দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যান। নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে!
কথা শেষ হওয়ার আগেই গর্জন করতে করতে পানি গ্রামের ভেতরে ঢুকে পড়ল। মুহূর্তেই উঠোন, রাস্তা, ক্ষেত, বাগান সব একাকার। মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের বুক চিরে এক বিশাল জলদানব পুরো গ্রামটাকে গিলে ফেলছে।
রাশেদের বাবা চিৎকার করে বললেন, যা পারো, মাথায় তুলে নাও! সময় নেই! কিন্তু সময় যেন কারও জন্য অপেক্ষা করল না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাঁটু, তারপর কোমর, তারপর বুকসমান পানি। ঘরের আলমারি উল্টে গেল, খাট ভেসে উঠল, চালের বস্তা পানিতে তলিয়ে গেল। গরুটি গোয়াল ভেঙে স্রোতে ভেসে যেতে লাগল। রাশেদ প্রাণপণ চেষ্টা করে দড়ি ধরে তাকে টেনে আনল।
ভোর হতেই দেখা গেল পুরো গ্রাম যেন নদীর মাঝখানে ভাসমান কয়েকটি টিনের ছাদ মাত্র।
তিন দিনের মাথায় ঘরের ভেতরে বাঁশের মাচা তৈরি হলো। সেই মাচাই এখন রান্নাঘর, শোবার ঘর, খাওয়ার টেবিল, শিশুদের পড়ার জায়গা সবকিছু।
মায়ের হাঁড়িতে ভাত ফুটছে, আর ঠিক নিচেই ঘরের পানিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে বড় বড় কৈ, শিং, টেংরা আর শোল মাছ। রাশেদ মজা করে বলল- মা, মনে হচ্ছে রান্না শেষ হওয়ার আগেই তরকারি নিজেই ঘরে চলে এসেছে!
মা হেসে বললেন, আল্লাহ কষ্টের মাঝেও রিজিকের রাস্তা খুলে দেন।
সেদিন বিকেলে রাশেদ আর তার বন্ধু জাহিদ একটি ছোট জাল নিয়ে বের হলো। কোথাও রাস্তা নেই, সবই নদী। হঠাৎ তারা দেখল একটি কলাগাছের পাশে বিশাল একটি বোয়াল মাছ লাফাচ্ছে। দুজনে জাল ফেলতেই মাছটি এমন টান দিল যে নৌকাই কাত হয়ে গেল। অনেক যুদ্ধের পর যখন মাছটি উঠল, পুরো নৌকা আনন্দে ভরে গেল। কিন্তু আনন্দ বেশিক্ষণ টিকল না।
রাতে মাচার নিচে অদ্ভুত শব্দ। টর্চের আলো ফেলতেই দেখা গেল তিনটি গোখরা সাপ পানির ওপর ফণা তুলে আছে। স্রোতের সঙ্গে ভেসে এসে আশ্রয় নিয়েছে তাদের ঘরের ভেতরেই।
মা নিঃশব্দে ছোট ভাইটিকে কোলে তুলে নিলেন। বাবা বাঁশের লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন। বাইরে ঝড়, ভেতরে সাপ কোন দিকে যাবে তারা?
ঠিক তখন পাশের বাড়ির বৃদ্ধ আবদুল কাদের চাচা নৌকা নিয়ে এগিয়ে এলেন। গ্রামের কয়েকজন মিলে অনেক কষ্টে সাপগুলোকে তাড়িয়ে দিলেন।
দিন যত গড়াতে লাগল, নতুন নতুন সমস্যা দেখা দিল। বিশুদ্ধ পানির অভাবে মানুষ দূরের আশ্রয়কেন্দ্রে নৌকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছে। শিশুরা জ্বরে কাঁপছে, বৃদ্ধরা ওষুধ পাচ্ছেন না। চারদিকে মশা, জোঁক, বিচ্ছু আর বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব। এরই মধ্যে টেলিভিশনের খবর এল ঢাকায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও বাস বন্ধ, কোথাও অ্যাম্বুলেন্স আটকে আছে। মানুষ কোমরসমান পানি ঠেলে অফিসে যাচ্ছে। রাজধানীও যেন বন্যার কাছে অসহায়।
দেশের বিভিন্ন জেলাও পানির নিচে। হাজার হাজার পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে। কারও ফসল নেই, কারও ঘর নেই, কারও কাছে শুকনো খাবারও নেই।
এক রাতে গ্রামের এক গর্ভবতী মায়ের প্রসববেদনা উঠল। চারদিকে অন্ধকার, রাস্তা নেই, শুধু উত্তাল পানি। গ্রামের যুবকেরা বাঁশ, ড্রাম আর কলাগাছ বেঁধে অস্থায়ী ভেলা বানাল। জীবন বাজি রেখে তারা সেই মাকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছে দিল। কয়েক ঘণ্টা পর খবর এলো একটি সুস্থ শিশুর জন্ম হয়েছে।
গ্রামের মানুষ বলল, এই শিশুর নাম হবে ‘আশা’। কারণ বন্যা সবকিছু ভাসিয়ে নিতে পারে। কিন্তু আশাকে নয়।
প্রায় তিন সপ্তাহ পর পানি নামতে শুরু করল। কাদায় ভরা উঠোনে দাঁড়িয়ে রাশেদ দেখল, তাদের আমগাছটি এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সে গাছটিকে জড়িয়ে ধরে মনে মনে বলল,
প্রকৃতি কখনো রাগ করে, কখনো ভালোবাসে। কিন্তু মানুষ যদি একে সম্মান করতে শেখে, একে রক্ষা করতে শেখে, তাহলে প্রতিটি বন্যার পরও নতুন জীবন জন্মাবে।
কেএমএএ/আপ্র/২৪.০৭.২০২৬