গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

মেনু

লোককথা: রাজকীয় পোশাক ও সিংহাসন ছেড়ে ফকিরি বেশ নেন গাজী

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৫৮ পিএম, ০৮ মে ২০২৬ | আপডেট: ২১:২৯ এএম ২০২৬
লোককথা: রাজকীয় পোশাক ও সিংহাসন ছেড়ে ফকিরি বেশ নেন গাজী
ছবি

ছবি সংগৃহীত

১৫৩৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২০০ বছর সুলতানরা এই স্বাধীন বাংলা শাসন করেছিলেন। ওই সময় ঝিনাইদহের বৈরাট নগরে রাজত্ব করতেন সুলতান সেকান্দর শাহ। এখন বৈরাট নগরের অস্তিত্ব মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। সেকান্দর শাহর বড় ছেলের নাম বড় খাঁ গাজী। গাজীর মা অজিফা সুন্দরী ছিলেন বলি রাজার কন্যা। গাজী ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সংসার বিবাগী ও আধ্যাত্মিক ধ্যান-ধারণায় মগ্ন। রাজপ্রাসাদের ঐশ্বর্য তাকে টানল না। একদিন তিনি রাজকীয় পোশাক ও সিংহাসনের মোহ ত্যাগ করে ফকিরি বেশ নিলেন। সুলতানের এক পালিত পুত্র ছিলেন কালু। ভাইয়ের অনুগত কালুও রাজসুখ ছেড়ে তার সঙ্গী হলেন। তারা চলে এলেন বিরাট নগরের অদূরে ছাপাইনগরের বারোবাজারে। এ বিষয় নিয়েই এবারের সাহিত্য পাতার প্রধান রচনা

পুঁথির ভাষায় তাদের ওই যাত্রার বর্ণনা ছিল-
‘রাজ্যেশ্বর ত্যাজিয়া গাজী ফকিরি ধরিল,
কালু ভাই সঙ্গে লয়ে বনেতে চলিল।’

হাঁটতে হাঁটতে দুই ভাই পাড়ি জমালেন ভাটি অঞ্চলের সুন্দরবনের গহিনে। সেখানে গাজীর আধ্যাত্মিক প্রতাপে বনের হিংস্র বাঘ আর কুমিরেরা পর্যন্ত বশীভূত হয়ে গেল। ধারণা করা হয়, বাঘের চোখে চোখ রেখে এবং লাঠির সাহায্যে তিনি তাদের বশে আনতেন। কুমিরকেও একইভাবে সামলাতেন।

ছাপাইনগর এলাকায় কোনো মুসলমান বসতি ছিল না। সেখানে গাজী প্রথম ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন। হাসিলবাগের এক দরিদ্র তাতি তার অনুগ্রহে বিত্তশালী হলেন আর জামালগোদা নামের এক ব্যক্তির দুরারোগ্য ব্যাধি সেরে গেল। গাজীর এই অলৌকিক ক্ষমতার কথা চারদিকে বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ল। এরপর গাজী ও কালু উপস্থিত হলেন ব্রাহ্মণনগর এলাকায়। এখানকার সামন্ত রাজা মুকুট রায়ের এক পরম রূপবতী কন্যা ছিলেন চম্পাবতী। পুঁথিতে তার রূপের বর্ণনায় বলা হয়েছে-
‘চম্পাবতীর রূপ যেন বিজলী ঝিলিক,
চাঁদ-সুরুজ লজ্জা পায় দেখে এক তিলক।’

ফকির গাজী চম্পাবতীকে দেখে মুগ্ধ হলেন এবং বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে কালুকে রাজার দরবারে পাঠালেন। কিন্তু রাজা মুকুট রায় একজন নিঃস্ব ফকিরের পক্ষ থেকে আসা এ প্রস্তাবকে নিজের আভিজাত্যের অবমাননা বলে মনে করলেন। তিনি ক্রোধে কালুকে বন্দী করলেন। ফলে গাজীর সঙ্গে মুকুট রায়ের যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠল। গাজীর ছিল এক অদ্ভুত বাহিনী- বনের অসংখ্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাঘ। রণক্ষেত্রে গাজী যখন ডাক দিলেন, বাঘেরা রাজার বিশাল হস্তীবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পুঁথিতে সেই যুদ্ধের গর্জন আজও প্রতিধ্বনিত হয়-
‘গাজী বলে ওরে বাঘ শোন রে বচন,
মুকুট রায়ের সৈন্য তোরা কররে ভক্ষণ।’

রাজা মুকুট রায়ের প্রধান সেনাপতি দক্ষিণ রায় কুমির বাহিনী নিয়ে ডাঙার লড়াইয়ে নামলেন। কিন্তু ডাঙ্গায় কুমির বাঘের ক্ষিপ্রতার কাছে টিকতে পারল না। দীর্ঘ সাত দিনের লড়াইয়ের পর রাজা মুকুট রায় পরাস্ত হলেন। হয়তো তাদের মধ্যে সাধারণ যুদ্ধই হয়েছিল। এত আগের ঘটনা যে মানুষ যুদ্ধের সেই ঘটনা ভুলে যাওয়ায় যুদ্ধকে কেন্দ্র করে কিছু গল্প মনে রাখতে শুরু করে। অর্থাৎ সম্ভবত বাস্তব কোনো যুদ্ধই পরবর্তীকালে লোককথার অলৌকিক রূপ পেয়েছে।

যাই হোক, পরাজয় নিশ্চিত দেখে রাজমহিষীরা ‘মৃত্যুঞ্জীব কূপে’ প্রাণ বিসর্জন দিলেন। অবশেষে চম্পাবতী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন এবং গাজীর সঙ্গে তার পরিণয় সম্পন্ন হলো। আজও ঝিনাইদহের বারোবাজারের বাদুরগাছা মৌজায় পাশাপাশি পাথর বাঁধাই করা তিনটি কবর- গাজী, কালু ও চম্পাবতীর লোকস্মৃতির সাক্ষী হয়ে আছে।গাজী ও দক্ষিণ রায়ের ওই আধ্যাত্মিক ও সামরিক সংঘাত থেকেই জন্ম নিল সুন্দরবনের আরেক বড় বিশ্বাস-বনবিবির আখ্যান।

মুন্সী বয়ানউদ্দীনের পুঁথি অনুযায়ী, বনবিবি ও তার ভাই শাহ জাঙ্গলী এসেছিলেন মক্কা থেকে। তখন বনে বাঘরূপী দক্ষিণ রায়ের অত্যাচারে মানুষের জীবন ছিল ওষ্ঠাগত। ওই বনের ধারে থাকত এক পিতৃহীন বালক দুখু। দুখুর দুই ধূর্ত ও লোভী চাচা ছিল—ধনা আর মনা। তারা প্রচুর মধু আর মোমের লোভে দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে এক পৈশাচিক চুক্তিতে লিপ্ত হলো। মধুর বিনিময়ে তারা অসহায় দুখুকে বাঘরূপী দক্ষিণ রায়ের হাতে তুলে দিল এবং মাঝরাতে একা ফেলে পালিয়ে গেল। পুঁথিতে দুখুর ওই আর্তনাদ আজও করুণ-
‘চাচারা ফেলিয়া মোরে পলাইল তরাসে,
বাঘরূপী যম বুঝি আসিল মোর পাশে।’

দক্ষিণ রায় যখন দুখুকে ভক্ষণ করতে তেড়ে এল, তখন দুখু চিৎকার করে বনবিবির দোহাই দিল। সঙ্গে সঙ্গে বনবিবি ও শাহ জাঙ্গলী আবির্ভূত হলেন। শাহ জাঙ্গলী তার জাদুকরি লাঠি দিয়ে দক্ষিণ রায়কে তাড়া করলেন। পরাজিত রায় পালিয়ে গিয়ে বড় খাঁ গাজীর পায়ে আশ্রয় নিলেন। গাজীর মধ্যস্থতায় এবং শ্রীহরির অলৌকিক উপস্থিতিতে দুই পক্ষের মধ্যে এক ঐতিহাসিক সন্ধি হলো। স্থির হলো, মানুষ বন থেকে কেবল জীবনধারণের প্রয়োজনটুকু নেবে, কোনো লোভ করবে না। আর বাঘও কোনো নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি করবে না। ওই সন্ধির মূল সুর ছিল সম্প্রীতি-
‘একহি অদ্বৈত রূপ নাম মাত্র ভেদ,
পুরাণ কোরান মতে নাহিক প্রভেদ।’

বনবিবি দুখুকে উদ্ধার করে সাত নৌকা মধু দিয়ে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিলেন। ওই থেকে সুন্দরবনে হিন্দু-মুসলিম সব ধর্মের মানুষ গাজীর দোহাই আর বনবিবির আশীর্বাদ নিয়ে অরণ্যে প্রবেশ করে।

আপ্র/কেএমএএ/০৮.০৫.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

আন্তর্জাতিক উৎসবে সেরা সিনেমাটোগ্রাফি অর্জন নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপ্তকের
২৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক উৎসবে সেরা সিনেমাটোগ্রাফি অর্জন নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপ্তকের

আবু তাহের, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: চীনের সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘বেস্ট সিনেমাটোগ্...

গান-কবিতায় শুরু ছায়ানটের নজরুল উৎসব
০৬ জুন ২০২৬

গান-কবিতায় শুরু ছায়ানটের নজরুল উৎসব

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী ‘নজরুল-উৎসব ১৪৩৩’-এর সূচনা হয়েছে ছায়ান...

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ
২৫ মে ২০২৬

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ। বিদ্রোহ, মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক...

নজরুলবর্ষ ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
২৩ মে ২০২৬

নজরুলবর্ষ ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আগামী এক বছর (২৫ মে, ২০২৬ থেকে ২৫ মে, ২০২৭) সময়কালকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

২০২৫ সালে সেবা খাতে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা

দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে ২০২৫ সালে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ আনুমানিক ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, এই পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আপনি কি মনে করেন এই জরিপ সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে