গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

মেনু

স্মরণে রবীন্দ্রনাথ: কিশোর কবির বিশ্বজয়

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৫২ পিএম, ০৮ মে ২০২৬ | আপডেট: ২০:১২ এএম ২০২৬
স্মরণে রবীন্দ্রনাথ: কিশোর কবির বিশ্বজয়
ছবি

ছবি সংগৃহীত

ড. মো. ফোরকান আলী    

রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়েছিল কলকাতার এক পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (২৫ বৈশাখ ১২৬৮) বাংলার দিকপাল কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও দার্শনিক। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি প্রথম কবিতা লেখেন। ১৮৮৭ সালে মাত্র ষোলো বছর বয়সে ‘ভানুসিংহ’ ছদ্মনামে তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে সাহিত্যে প্রথম বাঙালি এবং এশীয় হিসেবে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। নোবেল ফাউন্ডেশন তার কাব্যগ্রন্থটিকে বর্ণনা করেছিল একটি ‘গভীরভাবে সংবেদনশীল, উজ্জ্বল ও সুন্দর কাব্যগ্রন্থ’ রূপে। এর আগে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার দ্বিতীয় বৎসরে এক কিশোর কবির ‘ভারতভূমি’ নামে একটি কবিতা মুদ্রিত হয়।

‘বঙ্গদর্শন’ বাংলা ভাষায় প্রথম উন্নতমানের পত্রিকা এবং তার সম্পাদক স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পরবর্তীকলে যাকে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল ‘সাহিত্য সম্রাট’ এবং সারা ভারতে প্রায় সমস্ত ভাষাতেই তিনি উপন্যাস রচনার পথ প্রদর্শক হিসেবে স্বীকৃত। এহেন ‘বঙ্গদর্শন’-এ এক কিশোরের কাঁচাহাতের কবিতা স্থান পেল কী করে? কে এই কবি? তখনকার দিনের পত্রপত্রিকায় অধিকাংশ রচনারই লেখকের নাম ছাপা হতো না। তবে সম্পাদক একটি টীকা লিখে মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘এই কবিতাটি একটি চতুর্দশবর্ষীয় বালকের রচিত বলিয়া আমরা গ্রহণ করিয়াছি। কোনো কোনো স্থানে অল্প মাত্র সংশোধন করিয়াছি এবং কোনো কোনো অংশ পরিত্যাগ করিয়াছি।’ এ মন্তব্য দেখে বোঝা যায় যে এ কিশোর কবিকে বঙ্কিমচন্দ্র ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। অধিকাংশ জীবনী লেখক এবং প্রবন্ধকারের মতে, এই কিশোর কবি অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ।

বঙ্কিমচন্দ্রের যাতায়াত ছিল ঠাকুরবাড়িতে। রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন তার সুহৃদ। এমন তো হতেই পারে যে দ্বিজেন্দ্রনাথ তার সবচেয়ে ছোট ভাইয়ের লেখা একটি কবিতা পড়তে দিয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রকে। তিনি সেটি মোটামুটি পছন্দ করে। কিছতা কাটাকাটি করে ছাপিয়ে দেন নিজের পত্রিকায়। বঙ্কিম লিখেছেন, কবির বয়স চৌদ্দ বছর। প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন বারো বৎসর কয়েক মাস। তবে সমসাময়িক সাক্ষ্যে কয়েকবারই জানা গেছে যে, কৈশোরে রবীন্দ্রনাথকে তার বয়সের চেয়ে বড় দেখাত। সেই নামহীন কিশোরের দেশাত্মবোধক কবিতাটি এমনই উল্লেখযোগ্য যে, অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে এর কয়েকটি ছত্র উদ্ধৃত হয়েছিল এবং সম্পাদক শিশির কুমার ঘোষ সেখানেও মন্তব্য করেছিলেন যে ‘আমরা বোধহয় এই বালকটিকে (কবিকে) চিনি।’ ঠাকুরবাড়িতে শিশিরকুমারের যাতায়াত ছিল, সুতরাং ঠাকুরবাড়ির ছোট ছেলেটির প্রতিই তিনি ইঙ্গিত করেছেন বলে মনে হয়।

সে যা-ই হোক, এরপর এক বছরের মধ্যেই ‘তত্ত্ববোধিকা’ পত্রিকায় ‘অভিলাষ’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতা প্রকাশিত হয়। এখানেও কবির নাম নেই, কিন্তু কবিতাটির নিচে লেখা ছিল ‘দ্বাদশ বর্ষীয় বালকের রচিত।’ পরিণত বয়সে কবিতাটি রবীন্দ্রনাথকে দেখানো হলে তিনি স্বীকৃতি দিয়ে বলেছিলেন যে, সেটি তারই বাল্য রচনা। অর্থাৎ বারো-তেরো বছর বয়সেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। এমনকি সেকালে জাতীয়তাবোধে জাগাবার জন্য প্রতি বৎসর যে হিন্দুমেলার আয়োজন করা হতো, সেখানেও একবার শুধু এই কিশোর কবিকেই কবিতা পাঠের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

একটা গাছতলায় দাঁড়িয়ে এই অনিন্দ্যকান্তি, রূপবান কিশোরটির সুরেলা কণ্ঠে দেশাত্মাবোধক কবিতা পাঠের দৃশ্য চোখে দেখে সেকালের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিও মুগ্ধ হয়েছেন। তবে কি অভিজাত ঠাকুর পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান বলেই রবীন্দ্রনাথ এমন সুযোগ পেয়েছিলেন? অনেকটা তা সত্যি তো বটেই। পারিবারিক পরিচিতি নেই, এখন এই বয়সের সমস্ত উদীয়মান কবিকেই তাদের রচনা প্রকাশ করার জন্য অনেক সাধনা, অনেক সংগ্রাম করতে হয়। রবীন্দ্রনাথকে সে রকম কিছুই করতে হয়নি, সম্পাদকরা তার লেখা চেয়ে চেয়ে নিয়েছেন। এমনকি কৈশোর ছাড়াবার আগেই তার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হয়ে বেরোয় পারিবারিক সহায়তায়। রবীন্দ্রনাথের সেই প্রস্তুতি পর্ব ও গড়ে ওঠার কাহিনি বিস্ময়কর। পৃথিবীর খুব কম কবির ভাগ্যে এমন সুযোগ ঘটে। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি আজ বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র। সেখানে মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগর এবং দেশের অধিকাংশ বিদ্বজ্জন এবং লেখকের সমাবেশ হতো। রবীন্দ্রনাথের বড় দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন প্রসিদ্ধ কবি এবং দার্শনিক, অন্য এক দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, নাটক রচনা, গান লেখা ও সংগীতের নানা রকম পরীক্ষায় মেতে থাকতেন। বাড়িতে প্রায় সর্বক্ষণই সাহিত্য ও সংগীতের পরিবেশ।

পারিবারিক সদস্যরা মিলে নাটকের অভিনয় করতেন প্রায়ই। এসব কিছুর মধ্যেও রবীন্দ্রনাথের বিদ্যাশিক্ষাও থেমে থাকেনি। সবাই জানে, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন স্কুল পালানো ছেলে। ক্লাস রুমে বসে থাকা তার কাছে অসহ্য মনে হতো। পরীক্ষায় বসা ছিল আরও কষ্টকর। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির এই কনিষ্ঠ সন্তানটি যাতে মূর্খ না থেকে যায়, সে জন্য তার অভিভাবকেরা একসময় যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন। তার জন্য ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের কোনো কোনো দাদা বাড়িতে তাকে পড়াতেন এবং তার জন্য কয়েকজন গৃহশিক্ষকও নিযুক্ত করা হয়েছিল। পিতা দেবেন্দ্রনাথ যেবার শুধু ছেলেটিকেই সঙ্গে নিয়ে সিমলা পাহাড়ে গিয়েছিলেন কয়েকমাসের জন্য; সেই সময় রবীন্দ্রনাথ মোটেই অলসভাবে সময় কাটাবার সুযোগ পাননি।

দেবেন্দ্রনাথ নিজে দুবেলা ছেলেকে পড়াতে বসাতেন। তিনি পড়াতেন সংস্কৃত ও ইংরেজি সাহিত্য, ইতিহাস, এমনকি জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যন্ত। দেবেন্দ্রনাথ ছেলের জন্য যেসব বই সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই তালিকায় দেখা যায়, পিটার পার্লেস সিরিজের ‘টেলস অ্যাবাউট লাইফ অব ওয়াশিংটন অ্যান্ড ফ্রাঙ্কলিন’ এবং ‘টেলস অ্যাবাউট সান, মুন, স্টারস অ্যান্ড কমেটস।’ বাড়িতেও গৃহশিক্ষকের কাছে তিনি পড়েছেন ডগলাস সিরিজের ‘পলিটিকাল সিলেকশন’, ‘হিলিস গ্রামার এবং উইলসন’র এটিমলজি। সেই সঙ্গে ই. লেথব্রিজের ‘সিলেকশন ফর মডার্ন ইংলিশ লিটেরেচার।’ বইটি রয়্যাল সাইজের চারশ পৃষ্ঠা, দাম দুই টাকা। আর একটি তথ্যও খুব বিস্ময়কর। গৃহশিক্ষকরা তাকে পড়াতেন শেক্সপীয়রের ম্যাকবেথ এবং কালিদাসের কুমারসম্ভব কাব্য। শুধু পাঠই নয়, ওই দুই কাব্য তাকে অনুবাদও করতে হতো। প্রতিদিন ম্যাকবেথের কয়েকটি পাতা বাংলা পদ্যছন্দে অনুবাদ না করতে পারলে তাকে ঘরের দরজা বন্ধ করে আটকে রাখা হতো।

প্রভাতের সূর্যের মতোই তিনি উদিত হলেন বাংলা কবিতার আকাশে। কবিতার সঙ্গে সঙ্গে কিছু গানও রচনা করে চলেছেন। এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তেইশ বছর বয়স থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন প্রকৃত মৌলিক কবি ও গদ্য লেখক হিসেবে সাহিত্যজগত জয় করতে এলেন। তথ্যসূত্র: শান্তিনিকেতনের স্মৃতিচারণ ১৯৪৫।

লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ

আপ্র/কেএমএএ/০৮.০৫.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

আন্তর্জাতিক উৎসবে সেরা সিনেমাটোগ্রাফি অর্জন নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপ্তকের
২৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক উৎসবে সেরা সিনেমাটোগ্রাফি অর্জন নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপ্তকের

আবু তাহের, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: চীনের সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘বেস্ট সিনেমাটোগ্...

গান-কবিতায় শুরু ছায়ানটের নজরুল উৎসব
০৬ জুন ২০২৬

গান-কবিতায় শুরু ছায়ানটের নজরুল উৎসব

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী ‘নজরুল-উৎসব ১৪৩৩’-এর সূচনা হয়েছে ছায়ান...

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ
২৫ মে ২০২৬

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ। বিদ্রোহ, মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক...

নজরুলবর্ষ ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
২৩ মে ২০২৬

নজরুলবর্ষ ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আগামী এক বছর (২৫ মে, ২০২৬ থেকে ২৫ মে, ২০২৭) সময়কালকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

২০২৫ সালে সেবা খাতে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা

দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে ২০২৫ সালে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ আনুমানিক ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, এই পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আপনি কি মনে করেন এই জরিপ সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে