তানজিদ শুভ্র
‘আপনি কি পুরো রাস্তা এই এক পৃষ্ঠাই পড়বেন?’
খোলা বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলতেই দেখলাম, পাশের সিটের ছেলেটা রীতিমতো ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। বয়স পনেরো-ষোলোর বেশি হবে না। পরনে ডেনিম শার্ট, কাঁধে একটা আধখোলা ব্যাকপ্যাক।
আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাসলাম, ‘কই, না তো!’
‘গত দশ মিনিট ধরে আপনি এই একটা পেজেই আটকে আছেন।’
ছেলেটার গলায় স্পষ্ট আত্মবিশ্বাস আর বয়সোচিত চপলতা, ‘বাই দ্য ওয়ে, আমি সাদমান।’
আমি বইটা বন্ধ করে কোলের ওপর রাখলাম, ‘আমি শুভ্র। আর হ্যাঁ, তোমার অবজারভেশন বেশ তীক্ষ্ণ।’
সাদমান হাসল। তারপর কানের হেডফোনটা ঠিক করতে করতে জানালার বাইরে দৃষ্টি ফেরাল।
ট্রেন ছুটছে।
আশ্বিনের বিকেল। নীল আকাশজুড়ে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। বাতাসের আর্দ্রতায় বর্ষার সেই ভারী ভাবটা আর নেই বরং ভেজা মাটি আর হাওয়ার ফাঁকে শরতের এক মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। জানালার বাইরে আদিগন্ত সবুজের ভেতর দিয়ে হঠাৎ হঠাৎ মাথা উঁচিয়ে থাকছে কাশবন। রেলের জোড়ায় জোড়ায় একটানা ধাতব শব্দ উঠছে।
আমি আবার বইয়ের মলাটে হাত রাখলাম। সাদমানের ওই একটা কথাই বুকের ভেতর বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা একটা দরজার ছিটকিনি নেড়ে দিয়েছে।
‘তাহলে এতক্ষণ ধরে একই পৃষ্ঠা পড়ছেন কেন?’
বহু বছর আগে ঠিক এই কথাটাই বলেছিল তরী।
আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার দৃশ্যটা কোনো সিনেমার মতো ছিল না। বিকেলের ট্রেন। সিট নিয়ে হালকা ভুল বোঝাবুঝি, তারপর পাশাপাশি বসা। প্রথম আধঘণ্টা দুজনের কেউ কোনো কথা বলিনি। তারপর আচমকা আমার হাতের বইটার দিকে তাকিয়ে তরী ওই প্রশ্নটা করেছিল।
সেদিনই প্রথম বুঝেছিলাম, কিছু মানুষ শুধু চোখের ভাষাই পড়ে না, মনের ভেতরের স্থবিরতাও ধরতে পারে।
আমাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল খুব সাদামাটাভাবে। বই বদল করে। প্ল্যাটফর্মে কেনা কাগজের কাপের চা ভাগ করে। তরী অদ্ভুত ছিল। কখনো অনর্গল কথা বলত, আবার কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা জানালার বাইরে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকত।
একদিন শরতের আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘মানুষের জীবনও ট্রেনের মতো, জানো? সব স্টেশনে নামা যায় না।’
আমি বলেছিলাম, ‘তাহলে কোন স্টেশনে নামতে হয়?’
তরী সেদিন উত্তর দেয়নি। শুধু হেসেছিল।
আমরা একে অপরকে কোনো বড় প্রতিশ্রুতি দিইনি। শুধু ছোট ছোট ইচ্ছে ছিল। একদিন পাহাড় দেখব, নদীর ধারে বিকেল পার করব, আর ট্রেনে চড়ে দেশের সব ছোট স্টেশন ঘুরব। তেমনই এক দুপুরে আমরা নেমেছিলাম শরৎনগরে।
বৃষ্টিভেজা প্ল্যাটফর্ম। চায়ের দোকানের টিনের চাল থেকে টুপটাপ পানি পড়ছিল। তরী কাগজের কাপ হাতে নিয়ে বলেছিল, ‘জানো, এই স্টেশনের নামটা আমার খুব পছন্দ। মনে হয়, শরৎ যেন এখানেই স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে ফেলেছে।’
আমি বলেছিলাম, ‘তুমি সব নামের মধ্যেই গল্প খুঁজে পাও।’
‘আর তুমি গল্প লিখতে চেয়েও মানুষকে বিশ্বাস করাও যে তুমি শুধু শুনতে ভালোবাসো। লিখবে তুমি, একদিন ঠিক লিখবে।’
জীবন এরপর নিজের নিয়মে বাঁক নিয়েছে। পড়াশোনা শেষ, চাকরির যুদ্ধ, দায়িত্ব, সব মিলিয়ে দেখা হওয়ার ফাঁকগুলো ক্রমশ বড় হতে লাগল। একসময় কথা কমে গেল। কোনো ঝগড়া বা অভিমান ছাড়াই, শুধু দূরত্বের কারণে একদিন আমরা নিখোঁজ হয়ে গেলাম একে অপরের জীবন থেকে।
‘স্টেশন চলে আসছে!’
সাদমানের কথায় ঘোর কাটল আমার। ছেলেটা কাঁধে ব্যাগ তুলে নিয়েছে। ট্রেনের গতি কমতে শুরু করেছে। বাইরে পরিচিত সেই স্টেশনের কোলাহল, হকারের ডাক।
একটা মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রেনটা থামল।
সাদমান হাসিমুখে বলল, ‘আমি এখানেই নামব শুভ্র আঙ্কেল। ভালো থাকবেন।’
‘তুমিও।’
ছেলেটা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আমি অন্যমনস্কভাবে জানালার বাইরে তাকালাম। সাদা রঙের বড় সাইনবোর্ড। কালো অক্ষরে লেখা, শরৎনগর।
বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন ছলাৎ করে উঠল। এত বছর পর আবার সেই স্টেশন! আমি জানালা দিয়ে প্ল্যাটফর্মে চোখ বোলালাম। সেই পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছটা কি এখনো আছে?
ঠিক তখনই সাদমানকে দেখলাম ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতে। কয়েক কদম দূরেই এক নারী দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাদমানকে দেখে তিনি হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। নারীর পরনে হালকা নীল শাড়ি। বাতাসে আঁচল উড়ছে। সাদমান কিছু একটা বলতেই তিনি হাসলেন।
আমার শ্বাস আটকে গেল।
তরী!
সময়ের ছাপ হয়তো পড়েছে মুখে, কিন্তু ওই হাসিটা বদলায়নি একটুও। সেই একই রকম মায়া। সাদমান ওর ছেলে!
হুইসেল বেজে উঠল। ট্রেনটা একটা মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
আমার পকেটে ফোনটা রাখা। কিছুক্ষণ আগেই কনট্যাক্ট লিস্ট ঘেঁটে ওর নামের ওপর আঙুল থেমেছিল। চ্যাটবক্সে লিখেছিলাম, ‘আজ শরৎনগর পার হলামৃ’। মেসেজটা আর পাঠানো হয়নি।
ট্রেন গতি বাড়াচ্ছে।
আমি জানালার গ্রিল ধরে বসে আছি। প্ল্যাটফর্মটা পেছনে সরে যাচ্ছে। তরী আর সাদমান হাঁটতে শুরু করেছে বাইরের গেটের দিকে। একবারের জন্যও তরীর চোখ এদিকটায় ঘুরল না। স্টেশনের নামফলকটা ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে একসময় কাশবন আর সবুজের আড়ালে মিলিয়ে গেল।
ফোনটা পকেট থেকে বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকালাম। টাইপ করা অসম্পূর্ণ মেসেজটা ব্যাকস্পেস চেপে একটানা মুছে দিলাম।
সব স্টেশনে যে নামতে নেই, তরী সেদিন ঠিকই বলেছিল। কিছু স্টেশন শুধু দূর থেকে দেখে পার হয়ে যাওয়ার জন্যই থাকে।
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬