মাহমুদ আহমদ
প্রত্যেকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যেন হু হু করে বাড়ছে। তৈরি করা হচ্ছে কৃত্রিম সংকট। ইতোমধ্যে বর্তমান সরকারের এক মন্ত্রীর পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, দেশের কোথাও এলপিজির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত অনলাইন বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন। তার এ নির্দেশকে আমরা সাধুবাদ জানাই।
সম্প্রতি দেশে জ্বালানি তেলের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সারের সংকট দেখা দিয়েছে। যার ফলে কৃষক থেকে সাধারণ মানুষ সবার মাঝেই যেন এক ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। আমাদের দেশের সাধারণত একবার কোনো জিনিসের দাম বৃদ্ধি পেলে তা আর কোনো দিন কমেছে বলে আমার জানা নেই।
বর্তমানে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার লোভে মালপত্র গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। ইসলাম ব্যবসায়-বাণিজ্য উৎসাহিত করতে যেমন বিভিন্ন রকম জাগতিক এবং পারলৌকিক প্রাপ্তির ঘোষণা দিয়েছে, তদ্রুপ বিভিন্ন ধরনের নৈরাজ্য ও অবাঞ্ছনীয় পদক্ষেপ প্রতিরোধে জাগতিক এবং পারলৌকিক শাস্তিও ঘোষণা করেছে। পণ্য সামগ্রী জমা রেখে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সমাজের দুর্ভোগ বৃদ্ধি ও অতি মুনাফা অর্জন করাকে ইসলামে দণ্ডনীয় কাজ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
ইসলামি আইনশাস্ত্র বিদদের মতে, ইসলামি পরিভাষায় মজুদদারি হচ্ছে, খাদ্যশস্য মজুত করে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করা। অত:পর মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা বিক্রি করে প্রচুর পরিমাণে লাভবান হওয়া। ইসলাম মানবতাকে এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রদান করে- যা সব বৈষম্য ও অসমতা দূরীভূত করে দিয়ে ইনসাফভিত্তিক এক অনন্য সমতার সমাজ কায়েমের পথ নির্দেশ করে। এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সমাজের কোনো ব্যক্তির ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ন করার এবং কারও স্বার্থ বিনষ্ট করার কোনো রূপ সুযোগ নেই। এই অর্থনৈতিক মতাদর্শে পরিশ্রম করে সুখী সুন্দর জীবন গড়ার সুযোগ নিশ্চিত করে দেয়। ফলে মানবীক মূল্যবোধ সুদৃঢ় বুনিয়াদ লাভ করে। পারস্পরিক সম্পর্ক ও লেনদেনের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখার স্বার্থে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইসলাম নিয়ম-নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে ব্যবসায়-বাণিজ্য।
সম্প্রতি আমরা লক্ষ্য করেছি, বাজারে এমন কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নেই, যার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে না। অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়েছে কিন্তু এর তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে দ্রব্যমূল্যের এ ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে পড়েছে। অনেকে বলছেন, বিভিন্ন দেশের যুদ্ধের কারণে মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। আমি কোনোভাবেই নিজেকে মানাতে পারছি না যে, যুদ্ধ হচ্ছে ভিন্ন দেশে আর আমার দেশে সবজির মৌসুমেও দেখা যায় আশি টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া যায়না। এর হিসাব আমি মিলাতে পারি না কখনই।
আসলে অধিক মুনফা লোভীরা তাদের গুদামে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু খাদ্য দ্রব্য অবৈধ, অনৈতিকভাবে মওজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। গত বছর দেশের বিভিন্ন স্থানের গুদাম থেকে বস্তার বস্তা পচা পেঁয়াজ নদীতে ফেলার চিত্রও মিডিয়ায় প্রচার হতে আমরা দেখেছি। যদিও তাদের সংখ্যা কম, তবুও বাজার ব্যবস্থাকে ওই কমসংখ্যক লোকই নিয়ন্ত্রণ করছে। ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা-বাণিজ্য অন্যতম সম্মানজনক কাজ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যকে ইসলাম সব সময় উৎসাহিত করে থাকে। কিন্তু খাদ্যসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে অধিক মুনাফা অর্জনের মানসিকতাকে ইসলাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। দুনিয়া ও আখিরাতে মজুতদারির ভয়াবহ শাস্তির কথা কোরআনে বর্ণনা করা হয়েছে।
আল্লাহতাআলা ইরশাদ করেন, ‘যারা সোনা রুপা (ধন-সম্পদ) জমা করে এবং আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না তাদের জন্য আপনি যন্ত্রণাদায়ক আজাবের সংবাদ দিন। সে দিন এসব ধন-সম্পদ আগুনে গরম করা হবে। অত:পর তা দিয়ে তাদের কপাল, পাঁজর আর পিঠে দাগ দেওয়া হবে। (বলা হবে), তোমরা যা কিছু নিজেদের জন্য জমা করে রেখেছিলে, এগুলো তো সেসব ধন-সম্পদ। সুতরাং তোমরা যা কিছু জমা করে রেখেছিলে, এখন তার স্বাদ আস্বাদন করো’ (সুরা আত তাওবা: আয়াত ৩৪-৩৫)। অন্য এক স্থানে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘যাতে ধন-সম্পদ শুধু বিত্তবানদের মধ্যে পুঞ্জীভূত না হয়’ (সুরা আল হাশর: আয়াত ৭)।
ধন-সম্পদ পুঞ্জীভূত করে রাখাকে অর্থনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কেননা, এতে ধন-সম্পদ বিকেন্দ্রীকরণ ও বণ্টন হওয়ার পরিবর্তে শ্রেণি ও সম্প্রদায়-বিশেষের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে আর সাধারণ মানুষ হয় নি:স্ব ও দরিদ্র। লেনদেনেও স্থবিরতা দেখা দেয় এবং উন্নয়ন বাধাগস্ত হয়। অনুরূপভাবে পণ্য সামগ্রী আটকে রাখার ফলেও একইরকম সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং সম্পদ পুঞ্জীভূতকারী এবং পণ্য মজুদকারী সমান অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবে। আল্লাহতায়ালা তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করে অস্বাভাবিক ও অধিক মূল্যে বিক্রি করার জন্য গুদামজাত করে রাখাকে ইসলামের পরিভাষায় ‘ইহতিকার’ বা মজুদদারি বলা হয়। আল-হিদায়া প্রণেতার ভাষায় ‘ইহতিকার বা মজুদদারি হচ্ছে, খাদ্যসামগ্রী ক্রয় করে মূল্য বৃদ্ধির আশায় গুদামজাত করা।’ আল্লামা ইমাম ইবনে আবেদীন শামীর বলেন- ‘ইহতিকার হচ্ছে, খাদ্য সামগ্রী বা নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী ক্রয় করে উচ্চ মূল্যের জন্য চল্লিশ দিন পর্যন্ত আটক রাখা’। অর্থাৎ যে-সব জিনিস আটকিয়ে রাখলে বা মজুত করলে সর্বসাধারণের সীমাহীন কষ্ট ও ক্ষতি হয়।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মজুদদার খুবই নিকৃষ্টতম ব্যক্তি; যদি জিনিসপত্রের দাম হ্রাস পায় তাহলে চিন্তিত হয়ে পড়ে আর যদি মূল্য বেড়ে যায় তাহলে আনন্দিত হয়’ (মিশকাত)। তিনি (সা.) আরো ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি বাজারে পণ্যের অভাবের সময় পণ্য মজুত করে রাখে সে বড়ো পাপী’ (মুসলিম)।
পণ্যসামগ্রী মজুত করে দাম বৃদ্ধি অথবা অধিক মুনাফা করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। হাদিস শরিফে মজুদদারকে নিকৃষ্ট, অভিশপ্ত বলে অভিহিত করা হয়েছে। মজুদদার মূলত সেই ব্যক্তি, যে মানুষের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী সংগ্রহ করে এর মূল্য বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে গোপনীয় স্থানে আটক করে রাখে। পণ্যসামগ্রী মজুত করার কারণে জনসাধারণের দুঃখ-দুর্দশা ও কষ্ট-দুর্ভোগ বেড়ে যায়, অস্বাভাবিক হারে জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা লাভের সুযোগ ঘটে। এজন্য মজুদদার ও অধিক মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে হাদিসে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে এদেরকে পাপী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) ব্যবসায়ীদের পণ্য মজুতকরণ সম্পর্কে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমাদের বাজারে কেউ যেন পণ্য মজুত করে না রাখে। যাদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আছে তারা যেন বহিরাগত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সমস্ত খাদ্যশস্য কিনে তা মজুত করে না রাখে। যে ব্যক্তি শীত-গ্রীষ্মের কষ্ট সহ্য করে আমাদের দেশে খাদ্যশস্য নিয়ে আসে সে উমরের মেহমান। অতএব সে তার আমদানির খাদ্যশস্য যে পরিমাণে ইচ্ছা বিক্রি করতে পারবে, আর যে পরিমাণে ইচ্ছা রেখে দিতে পারবে’ (মুয়াত্তা ইমাম মালিক)।
ইমাম গাজ্জালির (রহ.) মতে, মজুদদারি হারাম। তিনি এর কারণ উল্লেখ করে বলেন, এতে আল্লাহর বান্দাদের কষ্ট ও অনিষ্ট সাধিত হয়ে থাকে। কোনো ব্যক্তি সব শস্য ক্রয়পূর্বক আটক করে রাখলে অবশিষ্ট সবাই এ থেকে বঞ্চিত থাকবে। এ উদ্দেশ্যে খাদ্যশস্য খরিদ ও মজুত করে রাখা পাপ।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমদানিকারক রিজিকপ্রাপ্ত হয়, আর মজুদদার হয় অভিশপ্ত।’ আরো বলা হয়েছে, ‘বিভ্রান্ত লোকই শুধু মজুতদারি করে।’ (ইবনে মাজা) তিনি (সা.) মজুতদারকে কঠোর শাস্তি প্রদানের কথা ঘোষণা করেছেন, ‘যে মুসলিম সম্প্রদায়ের খাদ্যদ্রব্য চল্লিশ দিন যাবৎ মজুত করে রাখবে, আল্লাহ তাকে দুরারোগ্য ব্যাধি ও দারিদ্র্য দিয়ে শাস্তি দিবেন’ (ইবনে মাজা)।
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য স্বাভাবিক রাখতে বাজারে নজরদারি বাড়ানো এবং সিন্ডিকেটধারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়া একটি স্বার্থান্বেষী মহল, যারা বিভিন্ন সময় গুজব ছড়িয়ে খাদ্য সামগ্রীর বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত, আর এজন্য সরকার-ব্যবসায়ী সব পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে।
দ্রব্যমূল্য মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত গুনাহের কাজ। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম কাজ।এমনটি যারা করে, তারা মূলত অনেক বড় একটি পাপ কাজ করে আর এই গুনাহগার ব্যক্তিরা আদৌ সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি লাভ করবে না। এই পাপ কাজ থেকে আল্লাহতাআলা আমাদের বিরত রাখুন। আমিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও ইসলামি চিন্তাবিদ
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬