জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ও সেরা তরুণদের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পাঠাতে সরকার সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। আগামী বছর থেকে এ উদ্যোগ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের এলডি হলে ‘বাংলাদেশ ইয়োথ মডেল ইউনাইটেড নেশনস ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন মাহ্দী আমিন। ‘ফিউচার বাংলাদেশ’-এর আয়োজনে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা জাতীয় ও বৈশ্বিক নীতি নিয়ে বিতর্কে অংশ নিচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার পরিকল্পনা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, দেশব্যাপী জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হলে দেশের প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। চূড়ান্তভাবে বিজয়ী ও সেরা হিসেবে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের সরকার নিজস্ব অর্থায়নে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। এর মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকার প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন তরুণরা। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, আগামী বছর থেকে এ প্রস্তাব প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করবে।
শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া - এ তিন ক্ষেত্রের সমন্বয়ে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বলে জানান মাহ্দী আমিন। এ পরিকল্পনার আওতায় দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। গণিত অলিম্পিয়াড, পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, নতুন কুঁড়ি, ক্বিরাআত ও হিফজ প্রতিযোগিতা, বিতর্ক এবং কুইজসহ শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের সব আয়োজনে সরকারের সর্বাত্মক সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
‘বাংলাদেশ ইয়োথ মডেল ইউনাইটেড নেশনস ২০২৬’ আয়োজনের জন্য আয়োজকদের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণ প্রজন্ম। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই আগামী দিনের নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প, রাজনীতি, নীতি প্রণয়ন ও সাংবাদিকতাসহ সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁরা দেশকে এগিয়ে নেবেন।
শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, তরুণদের উপস্থিতি প্রমাণ করে, দেশ নিয়ে তাঁদের সুন্দর স্বপ্ন ও সুস্পষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। নিজেদের প্রজন্মের সেরা হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁরা অদম্য প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে আসছেন। সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে তরুণদের মধ্যে সঠিক মূল্যবোধ, আদর্শ, মেধা, যোগ্যতা ও সততার চর্চা অপরিহার্য।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে তরুণরাই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। সে সময় তাঁরা বৈষম্যহীন ও মেধাভিত্তিক সমাজের ভিত রচনা করেছেন, যেখানে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, সরকার এমন বাংলাদেশ গড়তে বদ্ধপরিকর, যেখানে কোনো নাগরিকের সফল হওয়া কিংবা আত্মবিকাশের সুযোগ পেতে বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের প্রয়োজন হবে না। সমাজে ন্যায়বিচার ও সমতা বজায় থাকবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নিশ্চিত করা হবে স্বচ্ছতা ও কার্যকর জবাবদিহি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষা ও সৃজনশীল কার্যক্রমে আরো সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে হবে। ঐতিহাসিক সংসদ চত্বরের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, আজকের তরুণদের মধ্য থেকেই আগামী দিনে অনেকে সংসদ সদস্য ও নীতিনির্ধারক হিসেবে এ সংসদে বসে দেশ পরিচালনায় ভূমিকা রাখবেন।
নিজের শিক্ষার্থীজীবনের স্মৃতিচারণ করে মাহ্দী আমিন জানান, ২০০৭ সালে সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের বারুক কলেজে পড়ার সময় তিনিও ‘মডেল ইউনাইটেড নেশনস’-এ অংশ নিয়েছিলেন। তখন বারুক কলেজের প্রতিনিধিত্ব করে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তাঁর।
তিনি বলেন, বিশ্বের খুব কম দেশের তরুণদেরই এমন গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান - ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র সুরক্ষায় এ দেশের শিক্ষার্থীরা রাজপথে রক্ত দিয়ে মুক্তির পথ তৈরি করেছেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, বাংলাদেশের ভাগ্য তরুণদের ভাগ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বলে তাঁরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। দেশকে স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী করতে তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারণ করতে হবে। তরুণদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত ক্ষেত্রে পূর্ণ ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নীতি প্রণয়নের প্রতিটি স্তরে তাঁদের প্রত্যাশা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুগোপযোগী দক্ষতা অর্জন ও মানবসম্পদ উন্নয়নে নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তরুণদের মতামত সরাসরি যুক্ত করা জরুরি।
তরুণদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও উদ্ভাবনী ধারণা মনোযোগ দিয়ে শুনতে আয়োজকদের আরো বেশি ‘নীতি সংলাপ’ আয়োজনের আহ্বান জানান তিনি। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মাহ্দী আমিন বলেন, “তোমরাই আগামীর নেতা এবং তোমরাই দেশকে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে নেতৃত্ব দেবে।” তরুণদের পাশে থেকে অভিভাবকত্ব, সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে সরকার সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল-আওয়াল এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. ডেভিড ডাউল্যান্ড।
সানা/আপ্র/১৬/১০/২০২৬