রক্ষণাত্মক কৌশলে সাজানো প্যারাগুয়ের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছিল ফ্রান্স। দীর্ঘ সময় প্রতিপক্ষের জমাট রক্ষণ ভাঙতে না পারলেও শেষ পর্যন্ত অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে দিদিয়ের দেশমের দল।
ফিলাডেলফিয়ায় প্রচণ্ড গরমের মধ্যে অনুষ্ঠিত শেষ ষোলোর ম্যাচটি ছিল উত্তেজনা, কঠিন ট্যাকল, ধাক্কাধাক্কি ও বিতর্কে ভরপুর। পেনাল্টির সিদ্ধান্ত ঘিরে দীর্ঘ সময় মাঠে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। ম্যাচ শেষে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ম্যাচের শুরু থেকেই এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসেদের আটকাতে পুরোপুরি রক্ষণাত্মক কৌশল নেয় প্যারাগুয়ে। অধিকাংশ সময় তাদের ১০ জন আউটফিল্ড খেলোয়াড়ই নিজেদের ডি-বক্স ও আশপাশে অবস্থান নেন। বল দখলে স্পষ্ট আধিপত্য থাকলেও প্রথমার্ধে উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি করতে পারেনি ফ্রান্স। প্রথম ২৫ মিনিটে ৮০ শতাংশের বেশি সময় বল নিজেদের দখলে রেখেও কার্যকর আক্রমণ গড়তে ব্যর্থ হয় তারা।
৩১ মিনিটে ডান দিক থেকে দেম্বেলের বাড়ানো ক্রসে প্রতিপক্ষের চাপে হেডই করতে পারেননি এমবাপ্পে। ৩৫ মিনিটে আন্দ্রেস কুবাসের ট্যাকলে এমবাপ্পে পড়ে গেলে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। রেফারি পরিস্থিতি সামাল দেন। প্রথমার্ধে কোনো দলই লক্ষ্যে একটি শটও রাখতে পারেনি। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এটি মাত্র তৃতীয় ম্যাচ, যেখানে বিরতির আগে কোনো দল অন-টার্গেট শট নিতে পারেনি।
বিরতির পর ম্যাচের চিত্র বদলাতে শুরু করে। প্যারাগুয়ে কিছুটা ওপরে উঠে খেলতে গেলে আক্রমণের সুযোগ বাড়ে ফ্রান্সের। ৫২ মিনিটে গোলরক্ষক মাইক মাইনিয়ঁর লম্বা পাস ধরে সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যান এমবাপ্পে। তবে শেষ মুহূর্তে হুয়ান কাসেরেসের দারুণ ট্যাকলে রক্ষা পায় প্যারাগুয়ে। পরক্ষণেই মানু কোনের দূরপাল্লার জোরালো শট এক হাতে কর্নারের বিনিময়ে ফিরিয়ে দেন গোলরক্ষক অরলান্দো গিল।
অবশেষে ৭০ মিনিটে আসে ম্যাচের একমাত্র গোল। বদলি হিসেবে নামা দেজিরে দুয়েকে ডি-বক্সে ফেলে দিলে প্রথমে খেলা চালিয়ে যান রেফারি। পরে ভিডিও সহকারী রেফারির পরামর্শে মনিটরে দেখে সিদ্ধান্ত বদলে পেনাল্টি দেন। সেই স্পট কিক থেকে নিচু শটে গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন এমবাপ্পে।
পেনাল্টির সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি প্যারাগুয়ের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ। তারা দীর্ঘ সময় প্রতিবাদ জানান। হাইড্রেশন বিরতির সময়ও এমবাপ্পের সঙ্গে প্যারাগুয়ের এক খেলোয়াড়ের কথাকাটাকাটিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। গোলের পরও মাঠে একাধিক কঠিন ফাউল ও পাল্টাপাল্টি ট্যাকলে ম্যাচের উত্তাপ অব্যাহত থাকে।
গোল হজমের পর প্যারাগুয়ে আক্রমণে উঠলেও ফরাসি রক্ষণে বড় কোনো চাপ তৈরি করতে পারেনি। উল্টো শেষ দিকে ব্যবধান বাড়ানোর একাধিক সুযোগ পান এমবাপ্পে। নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে রায়ান শের্কির পাস থেকে নেওয়া তাঁর জোরালো শট রুখে দেন গিল। যোগ করা সময়েও এমবাপ্পের পরপর দুটি শট অসাধারণ দক্ষতায় প্রতিহত করেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক।
এই গোলের মাধ্যমে এবারের বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাত, সঙ্গে রয়েছে দুটি গোল করানোর কৃতিত্ব। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তিনি আবারও শীর্ষে উঠেছেন, সমান সাতটি গোল রয়েছে লিওনেল মেসিরও। বিশ্বকাপে এমবাপ্পের মোট গোল হলো ১৯টি, আর ২০ গোল নিয়ে তাঁর ওপরে আছেন কেবল মেসি। একই সঙ্গে টানা তিনটি বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে গোল করার কীর্তিও গড়েছেন ফরাসি অধিনায়ক।
শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পের একমাত্র গোলেই ১-০ ব্যবধানে জয় নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে ফ্রান্স। শেষ আটে তাদের প্রতিপক্ষ মরক্কো। আগের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও এই মরক্কোকেই হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল দেশমের দল।
সানা/আপ্র/৫/৭/২০২৬