দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় সাম্প্রতিক চার সফর বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। জাতীয় দল, বাংলাদেশ ‘এ’, হাই পারফরম্যান্স ও বাংলাদেশ ইমার্জিং—এই চার দলের হয়ে প্রায় ৬৩ জন ক্রিকেটার বিদেশের মাটিতে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২২ জনই ছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের অপেক্ষায়।
বড় পরিসরে বিদেশের ভিন্ন কন্ডিশনে নতুন ক্রিকেটারদের পরখ করার সুযোগ আগে খুব একটা পায়নি বাংলাদেশের নির্বাচকেরা। ফলে এসব সফর থেকে যেমন নতুন প্রতিভার সন্ধান মিলেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার আগে ক্রিকেটারদের কোথায় ঘাটতি রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার ও হাই পারফরম্যান্স দলের প্রধান কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন মনে করছেন, নিয়মিত এমন বিদেশ সফর আয়োজন করা গেলে জাতীয় দলের পাইপলাইন আরও শক্তিশালী হবে। বিদেশ সফরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত অর্জন এসেছে তৌহিদ হৃদয়ের ব্যাটে। দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে পচেফস্ট্রুমে বেসরকারি টেস্টে অপরাজিত ৩৫০ রান করে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড গড়েছেন তিনি।
দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে কোনো বিদেশি ব্যাটারেরও এটি সর্বোচ্চ প্রথম শ্রেণির ইনিংস। অস্ট্রেলিয়ায় আলো ছড়িয়েছেন রহস্য স্পিনার মো. রুবেল। ডারউইনে টপ এন্ড টি-টোয়েন্টি সিরিজে ২৩ উইকেট নিয়ে আলোচনায় এসেছেন ৩০ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। টুর্নামেন্টে একটি পাঁচ উইকেটের স্পেল ও দুটি চার উইকেটের স্পেল করেছেন তিনি।
তাঁর পারফরম্যান্স নজর কেড়েছে নির্বাচকদেরও। রুবেলকে নিয়ে হাবিবুল বাশার বলেন, ‘আমরা গত বছরের বিপিএল থেকেই তাঁকে অনুসরণ করছি। সে একজন রহস্য বোলার, নিয়মিত পারফর্ম করে। পাশাপাশি ভালো ফিল্ডারও। বয়স তাঁর পথে বাধা হবে না।’
বাশারের মতে, ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো করলেই একজন ক্রিকেটারের আন্তর্জাতিক মান বোঝা যায় না। বিদেশের মাটিতে ‘এ’ দলের সফর ক্রিকেটার ও নির্বাচকদের সেই পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। তিনি বলেন, ‘ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় একজন ক্রিকেটার কতটা ভালো, শুধু সেটি দিয়ে বোঝা কঠিন।
এ দলের সফর খেলোয়াড় ও নির্বাচকদের বুঝতে সাহায্য করে, তারা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।’ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সালাহউদ্দিনও। তাঁর মতে, দেশটির ক্রিকেটের উচ্চমানের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবধান এখনো অনেক।
বিশেষ করে পেস বোলিংয়ে ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। সালাহউদ্দিন বলেন, ‘হাই পারফরম্যান্স পর্যায়ে পরিপক্বতার দিক থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। আমাদের ফাস্ট বোলিংও তাদের মানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে কীভাবে বোলিং করতে হয়, আমাদের বোলাররা সেটি শিখছে।’
তবে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট সালাহউদ্দিন। তাঁর মতে, সাদা বলের ক্রিকেটে দুই দল প্রায় সমানে সমান লড়াই করেছে। লাল বলের ক্রিকেটেও বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাংলাদেশের দুই টেস্টের সিরিজ রয়েছে। তার আগে ‘এ’ দলের সফরকে বড় সুবিধা হিসেবে দেখছেন হাবিবুল বাশার। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই সফর কাজে দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বাশার বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় আমরা প্রায়ই সফরের শুরুতে উচ্চতার কারণে কিছু সমস্যায় পড়ি। এই কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় দল সেখানে যাওয়ার আগে এ দলের সফর হওয়াটা আমাদের জন্য ইতিবাচক।’ বিদেশ সফরে নতুনদের পাশাপাশি অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদেরও সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ৩৪ বছর বয়সী সাব্বির রহমান ও ৩৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ মিঠুনকে দলে নেওয়া হয়েছে।
টপ এন্ড টি-টোয়েন্টিতে সাব্বির দুটি ফিফটি করেছেন এবং আরেকটি ইনিংসে ৪৭ রান করেছেন। মিঠুন খেলেছেন বাংলাদেশ ‘এ’ দলের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের ওয়ানডে অংশে। বাশারের মতে, অবসর না নেওয়া পর্যন্ত কোনো ক্রিকেটারই নির্বাচকদের বিবেচনার বাইরে নন।
বয়সকেও নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দেখতে চান না তিনি। বাশার বলেন, ‘বয়স নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাধা হওয়া উচিত নয়। দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমরা বয়স বিবেচনা করব। কিন্তু সব সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি হয় না। ছয় মাস পরের কোনো টুর্নামেন্টে একজন খেলোয়াড়ের প্রয়োজন হলে, তার ভালো ফর্ম কাজে লাগানো যেতেই পারে।’
এসব বিদেশ সফর থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ক্রিকেটের পরবর্তী ধাপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সালাহউদ্দিন। তাঁর মতে, ‘এ’ দল, হাই পারফরম্যান্স কিংবা ইমার্জিং দলের হয়ে খেললে একজন ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বাদ পান। তখন নিজের প্রয়োজন ও ঘাটতি সম্পর্কে তাঁর ধারণা তৈরি হয়। বিদেশের কঠিন কন্ডিশনে খেলার অভিজ্ঞতা একজন ক্রিকেটারকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য আরও প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।
সব মিলিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় চার সফরে নতুনদের পারফরম্যান্স এবং অভিজ্ঞদের প্রত্যাবর্তন—দুই দিক থেকেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। এখন বিদেশের মাটিতে পাওয়া এই অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রতিভাকে জাতীয় দলের জন্য কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিই হবে নির্বাচক ও কোচদের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ।
ডিসি/আপ্র/০৯/০৯/২০২৬