জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরবরাহ স্বাভাবিক হবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও চার দিন পরও রাজধানীতে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে তেল পাওয়া গেলেও চালকদের দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। নীলক্ষেত এলাকায় মোটরসাইকেল চালকদের একই চিত্র দেখা গেছে। মতিঝিলের একটি ফিলিং স্টেশনে ভোর ৬টায় লাইনে দাঁড়িয়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তেল পেয়েছেন চালকেরা। অনেকেই জানিয়েছেন, একাধিক পাম্প ঘুরেও তেল না পেয়ে শেষে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হয়েছে। সারা দেশে প্রায় একই চিত্র। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা বাস্তবে মিলছে না
পাম্প মালিকদের অভিযোগ, সরকার সরবরাহ বাড়ানোর কথা বললেও বাস্তবে তা প্রতিফলিত হয়নি। এখনও রেশনিং পদ্ধতিতেই তেল দেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেক পাম্প দুপুরের পর বন্ধ হয়ে যায়, আবার কিছু পাম্প বিকালে তেল পায়। এতে চালকদের ক্ষোভ বাড়ছে, যদিও পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে তারা নিজেরাও চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না।
ময়মনসিংহে ভোর থেকে দীর্ঘ লাইন
ময়মনসিংহে তেলের দাম বাড়লেও পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনের চিত্র অপরিবর্তিত রয়েছে। ভোর থেকেই শত শত মোটরসাইকেল চালক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। সকাল ৮টার পর তেল সরবরাহ শুরু হলেও দুই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক চালক জানিয়েছেন, আগের মতোই ভোগান্তি রয়ে গেছে।
বরিশালে রেশনিং, আংশিক কমেছে মোটরসাইকেলের চাপ
বরিশালে এখনও রেশনিং পদ্ধতিতে তেল দেওয়া হচ্ছে, ফলে চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। তবে দাম বাড়ার পর মোটরসাইকেল চালকদের অতিরিক্ত তেল নেওয়ার প্রবণতা কমেছে। আগে ৫০০ টাকার তেল নেওয়ার চাহিদা থাকলেও এখন ২০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছেন তারা। এতে মোটরসাইকেলের লাইন কিছুটা কমলেও বড় ও ছোট যানবাহনের চাহিদা অপরিবর্তিত রয়েছে। অধিকাংশ সময় পাম্পে তেল থাকে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজবাড়ীতে কিছুটা স্বস্তি
রাজবাড়ীতে আগের তুলনায় ভিড় কিছুটা কমেছে। আগে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন থাকলেও এখন তা সীমিত হয়েছে। অপেক্ষার সময় সাত-আট ঘণ্টা থেকে কমে দেড় থেকে দুই ঘণ্টায় নেমেছে। কিছু ক্ষেত্রে এক ঘণ্টার মধ্যেই তেল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চালকেরা।
খুলনায় সরবরাহ বেড়েছে, তবু লাইন রয়ে গেছে
খুলনায় ২২ এপ্রিল থেকে তেল সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে এবং বিক্রিতে নির্দিষ্ট সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে। তবুও মোটরসাইকেলের লাইন পুরোপুরি কমেনি। বর্তমানে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা আগে চার-পাঁচ ঘণ্টা ছিল। পাম্প কর্তৃপক্ষ আশা করছে, এভাবে সরবরাহ চলতে থাকলে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
নারায়ণগঞ্জে সংকট ও অতিরিক্ত দামের অভিযোগ
নারায়ণগঞ্জে এখনও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অনেক চালক অভিযোগ করেছেন, নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দৈনিক চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক তেল সরবরাহ পাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রামে অপেক্ষার সময় কমেছে, ডিজেলে সংকট
চট্টগ্রামে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। আগে যেখানে সাত-আট ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো, এখন ৩০ থেকে ৪০ মিনিটেই তেল পাওয়া যাচ্ছে। পাম্পগুলোতে যানবাহনের লাইন কমেছে। তবে কিছু স্থানে ডিজেল সংকটের অভিযোগ রয়েছে, যদিও অকটেন তুলনামূলক সহজে পাওয়া যাচ্ছে।
গাজীপুরে আগের মতো ভিড়
গাজীপুরে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। কোন পাম্পে কবে তেল আসবে—এ তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর চালকেরা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা আগেই লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ছেন। সরবরাহ কম থাকায় পাম্পগুলোতে চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সিলেটে চাপ কিছুটা কমেছে
সিলেটে তেলের দাম বাড়ার পর কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। অনেক চালক প্রয়োজন ছাড়া যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। এতে পাম্পগুলোতে ভিড় কমেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও পুরোপুরি স্বাভাবিক পরিস্থিতি এখনও ফিরে আসেনি।
সুনামগঞ্জে কৃষিতে তেলের প্রভাব
হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জে তেলের সংকট সরাসরি কৃষিতে প্রভাব ফেলেছে। হারভেস্টার মেশিন চালাতে পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় ধান কাটায় বিলম্ব হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি খরচে ধান কাটাতে হচ্ছে এবং তেলের অভাবে ৫-৭ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ([ইধহমষধ ঞৎরনঁহব][১])
গ্রামাঞ্চলে অতিরিক্ত দামে তেল সংগ্রহ
অনেক এলাকায় পাম্পে তেল না পেয়ে খুচরা বাজারে বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে চালক ও কৃষকদের। এতে পরিবহন ও কৃষি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
সরকারি দাবি মজুত পর্যাপ্ত, কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ
সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে জ্বালানি তেলের মজুত সন্তোষজনক এবং আগের বছরের তুলনায় সরবরাহ বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কিছু অসাধু চক্র কৃত্রিমভাবে লাইনের চাপ সৃষ্টি করছে। ([ইঝঝ][২])
অভিযানে বিপুল তেল উদ্ধার
জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা আনতে সারাদেশে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মজুত তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এতে বাজার স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। ([ইঝঝ][৩])
মাঠপর্যায়ে স্বস্তি নেই
চলতি মাসে একাধিক জাহাজে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়েছে এবং সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে আগের ঘাটতির চাপ এখনও পুরোপুরি কাটেনি বলে মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
আংশিক উন্নতি, ভোগান্তি বহাল
দেশের কোথাও কোথাও পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অধিকাংশ এলাকায় এখনও কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর তেল পাওয়া যাচ্ছে। সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ চলমান থাকলেও চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য না হওয়ায় ভোগান্তি পুরোপুরি দূর হয়নি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মাঠপর্যায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
সানা/আপ্র/২৩/৪/২০২৬