গরমকাল মানেই ঘাম, ক্লান্তি আর তাপজনিত নানা ভোগান্তি-এমন ধারণাই আমাদের মধ্যে বেশি প্রচলিত। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেন, তীব্র গরমের মধ্যেও সর্দি, কাশি কিংবা গলাব্যথার মতো সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে-এমনটা কেন হয়?
অনেকের ধারণা, সর্দি-কাশি বা গলাব্যথা কেবল শীতের রোগ। বাস্তবতা ভিন্ন। গ্রীষ্মকালেও ভাইরাস সংক্রমণ, তাপমাত্রার আকস্মিক পরিবর্তন, ধুলাবালি, অ্যালার্জি এবং কিছু দৈনন্দিন অভ্যাসের কারণে এসব সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই গরমেও সর্দি-কাশি ও গলাব্যথার কারণ এবং প্রতিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
অতিরিক্ত ঠান্ডা পরিবেশে দীর্ঘ সময় থাকা
প্রচণ্ড গরম থেকে স্বস্তি পেতে অনেকেই দীর্ঘ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে অবস্থান করেন। বাইরে তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর ঘরের ভেতরে ২০ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস-এমন বড় ধরনের তাপমাত্রার পার্থক্য শরীরের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এতে গলা শুষ্ক হয়ে যেতে পারে এবং সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
ভাইরাস সংক্রমণ
ভাইরাস সংক্রমণ শুধু শীতকালেই সীমাবদ্ধ নয়। গরমকালেও বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে জনসমাগম, অফিস, স্কুল-কলেজ কিংবা গণপরিবহনে এসব সংক্রমণ দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে। এর ফলে সর্দি, কাশি, হাঁচি ও গলাব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
ধুলাবালি ও অ্যালার্জি
গ্রীষ্মকালে বাতাসে ধুলাবালির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে। পাশাপাশি ফুলের রেণু, ধোঁয়া ও অন্যান্য অ্যালার্জেন অনেকের শ্বাসতন্ত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে। ফলে নাক দিয়ে পানি পড়া, গলা চুলকানো, কাশি এবং গলাব্যথার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অতিরিক্ত ঠান্ডা পানীয় গ্রহণ
গরমে স্বস্তি পেতে অনেকেই বরফ মেশানো পানীয়, আইসক্রিম কিংবা অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি পান করেন। এতে গলার সংবেদনশীল টিস্যু সাময়িকভাবে প্রভাবিত হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে গলাব্যথা বা অস্বস্তি তৈরি হয়।
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়া
পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ এবং পানিশূন্যতা শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তখন সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সহজেই সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন সমস্যার শিকার হতে হয়।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
* নাক দিয়ে পানি পড়া
* বারবার হাঁচি
* গলা খুসখুস করা
* গিলতে ব্যথা হওয়া
* শুকনো বা কফযুক্ত কাশি
* মাথাব্যথা
* শরীরে দুর্বলতা
* হালকা জ্বর
যা যা করবেন-
পর্যাপ্ত পানি পান করুন: শরীর আর্দ্র রাখতে দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। পানি গলা আর্দ্র রাখে এবং শ্লেষ্মা পাতলা করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি ডাবের পানি, লেবুর শরবত বা ফলের রসও উপকারী হতে পারে।
কুসুম গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে গার্গল করুন: গলাব্যথা কমানোর সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো কুসুম গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে দিনে কয়েকবার গার্গল করা। এটি গলার প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন: সংক্রমণের সময় শরীরকে সুস্থ হয়ে উঠতে যথেষ্ট বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। তাই পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পুষ্টিকর খাবার খান: খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল-যেমন কমলা, মাল্টা, পেয়ারা ও আমলকি-এবং অন্যান্য তাজা ফল ও শাকসবজি রাখুন। এসব খাবার রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।
ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখুন: ধুলাবালি ও অ্যালার্জেন থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন। নিয়মিত ঘর পরিষ্কার রাখুন এবং প্রয়োজন হলে মাস্ক ব্যবহার করুন।
ঠান্ডা খাবার এড়িয়ে চলুন: গলাব্যথা থাকলে বরফযুক্ত পানীয়, আইসক্রিম কিংবা অতিরিক্ত ঠান্ডা খাবার কিছুদিনের জন্য কম খাওয়াই ভালো।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?
সাধারণ সর্দি-কাশি কয়েক দিনের মধ্যে সেরে যায়। তবে নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে-
* ১০ দিনের বেশি উপসর্গ স্থায়ী হলে
* ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি জ্বর হলে
* শ্বাস নিতে কষ্ট হলে
* তীব্র গলাব্যথা বা গলা ফুলে গেলে
* কাশির সঙ্গে রক্ত এলে
* অতিরিক্ত দুর্বলতা বা পানিশূন্যতা দেখা দিলে
প্রতিরোধে যা করবেন
* নিয়মিত হাত ধুয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন।
* পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
* সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
* পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
* বাইরে থেকে এসে সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানীয় পান না করাই ভালো।
* শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তাপমাত্রা খুব কম না রেখে ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখুন।
* ধুলাবালি বেশি থাকলে মাস্ক ব্যবহার করুন।
গরমে সর্দি-কাশি বা গলাব্যথা হওয়া মোটেও অস্বাভাবিক নয়। তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তন, ভাইরাস সংক্রমণ, অ্যালার্জি এবং কিছু দৈনন্দিন অভ্যাস এর জন্য দায়ী হতে পারে। তবে সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং ঘরোয়া কিছু পরিচর্যার মাধ্যমে এসব সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আর উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা গুরুতর আকার ধারণ করলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এবং মায়ো ক্লিনিক।
সানা/আপ্র/১০/৬/২০২৬