গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগপত্রে তিনি একাধিক দীর্ঘমেয়াদি রোগের পাশাপাশি একটি জটিল স্নায়বিক সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছেন- অটোনমিক নিউরোপ্যাথি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি এমন একটি রোগ- যা শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাস, হজম, ঘাম হওয়া, মূত্রাশয়ের কার্যক্রমসহ শরীরের বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হতে পারে না।
রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী এই রোগের কারণে তিনি মাঝে মধ্যে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েন বা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। একই সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। অতীতে তার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারিও হয়েছে। সব মিলিয়ে শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে আর সম্ভব নয় বলেই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কী এই অটোনমিক নিউরোপ্যাথি: অটোনমিক নিউরোপ্যাথি এমন একটি স্নায়বিক রোগ- যেখানে শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণত আমরা সচেতনভাবে যেসব কাজ নিয়ন্ত্রণ করি না, যেমন হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাস, হজম, ঘাম হওয়া কিংবা মূত্রাশয়ের কাজ- এসবই নিয়ন্ত্রণ করে এই স্নায়ুতন্ত্র। যখন এই স্নায়ুগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, তখন শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটে। রোগের মাত্রা ও আক্রান্ত অঙ্গের ওপর নির্ভর করে উপসর্গও ভিন্ন হতে পারে।
যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে: অটোনমিক নিউরোপ্যাথিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলোর একটি হলো দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া। এতে মাথা ঘোরা, চোখে অন্ধকার দেখা কিংবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন, শ্বাস নিতে অস্বস্তি, খাবার হজমে সমস্যা, বমিভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া, অতিরিক্ত বা খুব কম ঘাম হওয়া, মূত্রত্যাগে অসুবিধা এবং যৌনস্বাস্থ্যের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ ধীরে ধীরে বাড়ে আবার কারো ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে।
যে কারণে হয় এই রোগ: বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস অটোনমিক নিউরোপ্যাথির সবচেয়ে বড় কারণ। দীর্ঘ সময় রক্তে অতিরিক্ত শর্করা থাকলে ধীরে ধীরে স্নায়ুর ক্ষতি হয়- যার প্রভাব পড়ে স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রেও। এ ছাড়া কিছু অটোইমিউন রোগ, পারকিনসনস রোগ, অ্যামাইলয়ডোসিস, নির্দিষ্ট ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, কিছু ক্যানসারের চিকিৎসা, দীর্ঘদিন অ্যালকোহল সেবন এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও এই রোগ হতে পারে।
যেভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়: অটোনমিক নিউরোপ্যাথি শনাক্ত করতে চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ মূল্যায়নের পাশাপাশি বিভিন্ন পরীক্ষা করে থাকেন। রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দনের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ, হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি টেস্ট, টিল্ট টেবিল টেস্ট, ঘাম উৎপাদনের পরীক্ষা, মূত্রাশয়ের কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করা হতে পারে। রোগের মূল কারণ নির্ণয় করাও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চিকিৎসা কি সম্ভব: এই রোগের নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী চিকিৎসা এখনো নেই। তবে সঠিক চিকিৎসা ও জীবনধারার পরিবর্তনের মাধ্যমে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। যদি ডায়াবেটিসের কারণে রোগটি হয়ে থাকে, তাহলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ, পর্যাপ্ত পানি পান, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য ওষুধ ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে ধীরে ধীরে দাঁড়ানো, দীর্ঘক্ষণ একটানা দাঁড়িয়ে না থাকা এবং নিয়মিত চিকিৎসকের ফলোআপে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
দৈনন্দিন জীবনে যেসব প্রভাব ফেলে: অটোনমিক নিউরোপ্যাথি শুধু শারীরিক অস্বস্তিই তৈরি করে না, অনেক সময় কর্মজীবন ও দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকেও সীমিত করে দেয়। বারবার রক্তচাপ কমে যাওয়া বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় গাড়ি চালানো, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন কিংবা দীর্ঘ সময় কাজ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগটি সময়মতো শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করলে অনেক ক্ষেত্রেই উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে গুরুতর অবস্থায় এটি রোগীর জীবনযাত্রার মান এবং কর্মক্ষমতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মাথা ঘোরা, হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা দীর্ঘদিন ধরে রক্তচাপের অস্বাভাবিক ওঠানামার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
সূত্র: হেলথলাইন
কেএমএএ/আপ্র/২৬.০৭.২০২৬