বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব এসে পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ খাতে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে জেলা শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত তীব্র লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। কোথাও কোথাও দিনে আট থেকে নয় ঘণ্টা, আবার অনেক এলাকায় ১০ ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
গত বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিতরণে হিমশিম খেতে হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে। এলাকাভিত্তিক এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কথা থাকলেও বাস্তবে তা দুই ঘণ্টার বেশি হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি আরো নাজুক।
চট্টগ্রামে প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আট ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ মিলছে না। এতে গরমে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে এবং শিল্প উৎপাদনেও ব্যাঘাত ঘটছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, পিক আওয়ারে চাহিদা বাড়ায় লোডশেডিং আরো বেশি হচ্ছে।
বরিশালে চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে দিনে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানে ক্রেতা কমে যাচ্ছে এবং লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে। একই সঙ্গে গরমে সাধারণ মানুষ ও শিশুদের দুর্ভোগও বেড়েছে।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের ছয় জেলায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় এক হাজার ৭৫ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭৫০ মেগাওয়াট। ফলে দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, যা গ্রামাঞ্চলে দ্বিগুণ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সিলেটেও দিন-রাত সমানতালে লোডশেডিং চলছে। বাস্তবে দিনে নয় থেকে দশ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। আসন্ন পরীক্ষাকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগও বেড়েছে।
রংপুরে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং পরিস্থিতি আরো প্রকট হয়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় দিনে আট থেকে নয় ঘণ্টা, আবার গ্রামে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে।
খুলনাতেও বিদ্যুৎ সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকে নেমে এসেছে। পিক আওয়ারে বড় ধরনের ঘাটতির কারণে দিনে ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে অনেক এলাকায়। যদিও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে, তবুও সামগ্রিক ঘাটতি কাটছে না।
সার্বিকভাবে এপ্রিলের শুরু থেকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং বেড়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরো খারাপ, যেখানে অনেক সময় দিনে ছয় থেকে সাত ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, গ্যাস ও তেলের ঘাটতি এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে জনজীবন, কৃষি ও শিল্প-সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব আরো গভীর হতে পারে।
সুনামগঞ্জে অচলাবস্থা: চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহে সুনামগঞ্জ জেলায় জনজীবনে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। দিনে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেবামূলক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জেলায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ৪ লাখ ৫৩ হাজার গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহক প্রায় ৪ লাখ, পিডিবির শহর এলাকায় প্রায় ৩৫ হাজার এবং দিরাই জোনে প্রায় ১৮ হাজার গ্রাহক রয়েছে।
পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুৎ সূত্রে জানা গেছে, জেলার চাহিদার তুলনায় বর্তমানে অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। শহর এলাকায় দৈনিক প্রায় ১২ থেকে ১৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৪ থেকে সাড়ে ৫ মেগাওয়াট। একইভাবে দিরাই জোনে ৬ থেকে সাড়ে ৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২ থেকে আড়াই মেগাওয়াট।
অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় দৈনিক ৩৫ থেকে ৪৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র প্রায় ১৯ মেগাওয়াট। রাতের সময় চাহিদা আরো বেড়ে ৫৫ থেকে ৬৫ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও সরবরাহ তার অর্ধেকেরও কম থাকে।
এ পরিস্থিতিতে দিনের বড় একটি অংশ বিদ্যুৎবিহীন থাকায় গ্রাহকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। উৎপাদনমুখী ও সেবাখাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জেলা শহরের বাসিন্দারা জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে গরমে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীরাও পড়ালেখায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানায়।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা জানান, সরবরাহ ঘাটতির কারণে নির্ধারিত চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে এবং ফিডার নিয়ন্ত্রণ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তারা আরো জানান, পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
চাহিদা ও সরবরাহের এই বড় ব্যবধানের কারণে সুনামগঞ্জে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সানা/আপ্র/১৭/৪/২০২৬