যুদ্ধবিধ্বস্ত ও আতঙ্কিত বিশ্ববাসীর প্রেক্ষাপটে নির্ভয় সমাজ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিশ্বশান্তির প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-কে বরণ করেছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। নববর্ষের প্রথম প্রভাতে ঢাকার রমনার বটমূল প্রাঙ্গণে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী এই অনুষ্ঠানে উঠে এসেছে ভয়শূন্য সমাজ ও মুক্তচিন্তার আকাঙ্ক্ষা।
ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী বলেন, “মার্কিন-ইসরায়েলি নিগ্রহে আজ পারস্য সভ্যতাও ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন। বিশ্ববাসী আজ বিপর্যস্ত ও আতঙ্কিত। স্বদেশে আজ নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে সবাই কামনা করে বিশ্বশান্তি।” তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন—সংবাদকর্মীরা যেন নির্ভয়ে সত্য প্রকাশ করতে পারেন, শিল্পীরা যেন অবাধে গান গাইতে পারেন এবং সংস্কৃতির সব প্রকাশ যেন নির্বিঘ্ন হয়।
‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’ প্রতিপাদ্যে সাজানো এবারের বর্ষবরণ ছিল গান, আবৃত্তি ও বক্তব্যে সমৃদ্ধ বর্ণিল আয়োজন। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সম্মেলক গান ‘জাগো আলোক-লগনে’ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। এতে অংশ নেন মিরাজুল জান্নাত সোনিয়া, ঐশ্বর্য সমাদ্দার, প্রিয়ন্তু দেব ও সমুদ্র শুভম।
ষাটের দশকে রমনার বটমূলে ছায়ানট যে বর্ষবরণের সূচনা করে, তা এখন বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। ১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া এই আয়োজন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া প্রতি বছরই অনুষ্ঠিত হয়েছে; কোভিড মহামারির সময় দুই বছর ভার্চুয়ালি আয়োজন করা হয়।
২০০১ সালে এই বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে জঙ্গি হামলায় ১০ জন নিহত হন। এরপর থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেই আয়োজনটি হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে সারওয়ার আলী বলেন, ছায়ানট কার্যালয়ে হামলা, বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর, শিশুদের বই নষ্ট করা এবং বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা সমাজে অসহিষ্ণুতার শঙ্কা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাউল শিল্পীদের অপদস্থ হওয়ার ঘটনাও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, বাঙালির জীবনযাত্রা, মুক্তিযুদ্ধ ও অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত সংগীতকে অপশক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা চলছে। সমাজে মতপ্রকাশে দলবদ্ধ নিগ্রহের প্রবণতা বাড়ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এবারের অনুষ্ঠানে আটটি সম্মেলক ও ১৪টি একক গান এবং দুটি আবৃত্তি পরিবেশিত হয়; অংশ নেন প্রায় ২০০ শিল্পী। দেশপ্রেম, মানবিকতা ও লোকজ জীবনের সুরে ভরপুর পরিবেশনার পাশাপাশি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের গণসঙ্গীতজ্ঞ সলিল চৌধুরী এবং পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের গীতিকার-সুরকার মতলুব আলীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন মাকছুরা আখতার অন্তরা, আজিজুর রহমান তুহিন, সেমন্তী মঞ্জরী, তানিয়া মান্নান ও লাইসা আহমদ লিসা। নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন বিটু কুমার শীল, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, নাসিমা শাহীন ফ্যান্সি, খায়রুল আনাম শাকিল ও শারমিন সাথী ইসলাম ময়না। এছাড়া দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান পরিবেশন করেন শ্রাবন্তী ধর।
আবৃত্তি পরিবেশন করেন ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়; সত্যেন্দ্রনাথ দত্তসহ বিভিন্ন কবির কবিতা স্থান পায় অনুষ্ঠানে। সলিল চৌধুরীর ‘এক গুচ্ছ চাবি’ আবৃত্তি করেন খায়রুল আলম সবুজ।
সম্মেলক পরিবেশনায় ছিল ‘ভয় হতে তব অভয় মাঝে’, ‘জগতে আজিকে যারা’, ‘পথে এবার নামো সাথী’, ‘এসো মুক্ত করো’ ও ‘সেদিন আর কত দূরে’সহ নানা গান। লালন সাঁইয়ের ‘বড় সংকটে পড়িয়া দয়াল’ গানটি পরিবেশন করেন চন্দনা মজুমদার; পাশাপাশি আবদুল লতিফ, মতলুব আলী ও সাধন চন্দ্র বর্মণের গানও পরিবেশিত হয় দলীয় কণ্ঠে।
ছোট-বড় সবার অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন। শেষে জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে ছায়ানটের এই ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের।
অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় ছায়ানটের কর্মীদের পাশাপাশি সহায়তা করে থার্টিনথ হুসার্স ওপেন রোভার গ্রুপ ও এজিস সার্ভিসেস লিমিটেড। মঞ্চসজ্জায় ছিলেন মমিনুল হক দুলু ও রণজিত রায়।
সানা/আপ্র/১৪/৪/২০২৬
নির্ভয় সমাজের প্রত্যাশায় ছায়ানটের বর্ষবরণ
নিজেস্ব প্রতিবেদক
ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী বলেন, “মার্কিন-ইসরায়েলি নিগ্রহে আজ পারস্য সভ্যতাও ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন। বিশ্ববাসী আজ বিপর্যস্ত ও আতঙ্কিত। স্বদেশে আজ নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে সবাই কামনা করে বিশ্বশান্তি