সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ করতে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সকে আরো ছয় মাস সময় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী ২৯ এপ্রিল মামলার তদন্তের অগ্রগতি আদালতকে জানাতে বলা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। বাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী শিশির মনির।
আদালতে দাখিল করা তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার সঙ্গে আলোচনায় সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে দুজনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই-বাছাই এবং মামলায় অন্য কেউ জড়িত কি না, তা নির্ধারণের কাজ এখনো বাকি।
৩০০ সিডির মধ্যে ৯০টির মূল্যায়ন: আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের কাছ থেকে উদ্ধার করা প্রায় ৩০০টি সিডিতে বিভিন্ন তথ্য, কথোপকথন, ভিডিও, অডিও ও অপরাধসংক্রান্ত উপাত্ত থাকতে পারে। এর মধ্যে ৯০টি সিডির মূল্যায়ন শেষ হয়েছে। বাকি ২১০টি সিডি পর্যালোচনার কাজ এখনো শেষ হয়নি।
আদালতের আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে থাকা সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড-সম্পর্কিত তথ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র তদন্তকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হলে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে।
তিনি বলেন, শুধু প্রাথমিক তথ্য পাওয়াই যথেষ্ট নয়। ফৌজদারি তদন্তের নিয়ম অনুযায়ী, তথ্য-প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সন্তুষ্ট হতে হবে। এ জন্য ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করে লিখিতভাবে তথ্য-প্রমাণ চাওয়া হয়েছে।
এক বছর সময় চেয়েছিল রাষ্ট্রপক্ষ: মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, আগের ছয় মাসের সময়সীমা শেষ হওয়ায় মঙ্গলবার মামলাটি আদেশের জন্য আদালতে ওঠে। রাষ্ট্রপক্ষ তদন্তের অগ্রগতির কথা জানিয়ে আরো এক বছর সময় চেয়েছিল। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত ছয় মাস সময় দিয়েছেন।
শিশির মনির বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যে অগ্রগতির কথা জানিয়েছে, তা মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন প্রসিকিউটরের বরাত দিয়ে কিছু অগ্রগতি, সিডি ও দুজন ব্যক্তির নামের কথা জানানো হয়েছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করার জন্যই সময় চাওয়া হয়েছে।
বাদীপক্ষের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, সিডিগুলো মূল্যায়নের জন্য এত দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়। জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করা দরকার বলে তাঁরা আদালতকে জানিয়েছিলেন।
শিশির মনির আরো বলেন, ২৯ এপ্রিল টাস্কফোর্সের প্রধান এবং সিডিগুলোর বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর ও তদন্ত সংস্থার সদস্যরা আদালতে উপস্থিত হয়ে পর্যালোচনার অগ্রগতি জানাবেন বলে তাঁরা প্রত্যাশা করছেন।
এক যুগেও উন্মোচন হয়নি হত্যার রহস্য: ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া করা বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। তাঁদের একমাত্র ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ তখন বাসায় ছিল। সাগর সে সময় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙা টেলিভিশনে এবং রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলী রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন।
মামলা দায়েরের পর শেরেবাংলা নগর থানাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিন দিন পর মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল মামলাটির তদন্তভার র্যাবের কাছে দেওয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের শনাক্ত করে রহস্য উন্মোচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার রহস্য উন্মোচিত হয়নি।
এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তের দায়িত্ব থেকে র্যাবকে বাদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করে তদন্ত শেষ করতে ছয় মাস সময় বেঁধে দেন হাইকোর্ট। পরে তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে টাস্কফোর্সকে আরো সময় দেওয়া হলো।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৭/১০/২০২৬