একঘেয়ে শরীরচর্চায় অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তাঁদের জন্য আনন্দদায়ক বিকল্প হতে পারে নাচ। নিয়মিত মাত্র পাঁচ মিনিট নাচলেও শরীর ও মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এটি শুধু মুহূর্তের জন্য মন ভালো করে না, বরং মানসিক সুস্থতা, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা রাখে।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম বিবিসির জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য প্রতিবেদক মেলিসা হোজেনবুম নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, দীর্ঘ সময় নাচের প্রয়োজন নেই; দিনের ব্যস্ততার মাঝেও অল্প সময়ের নাচ শরীর ও মনকে সতেজ করে তুলতে পারে। তিনি এক সপ্তাহ প্রতিদিন কাজের ফাঁকে পাঁচ মিনিট করে নাচের অভ্যাস করেন। শুরুতে একা নাচতে কিছুটা অস্বস্তি লাগলেও প্রতিবার নাচের পর কাজে ফিরে নিজেকে আরো প্রাণবন্ত ও উদ্যমী মনে হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিশেষ করে দুপুরের খাবারের পর অনেকের মধ্যেই যে ঝিমুনি ও আলস্য দেখা দেয়, তা কাটাতে ছোট্ট একটি নাচের বিরতি কার্যকর হতে পারে। নাচ শরীরকে সক্রিয় করার পাশাপাশি কাজের প্রতি মনোযোগও বাড়াতে সাহায্য করে।
বাড়ে শারীরিক সক্ষমতা: যুক্তরাজ্যের নৃত্য মনোবিজ্ঞানী ও সাবেক পেশাদার নৃত্যশিল্পী পিটার লোভাট বলেন, মানুষের মধ্যে নড়াচড়া ও ছন্দের প্রতি সাড়া দেওয়ার প্রবণতা জন্মগত। এমনকি নবজাতক শিশুরাও ছন্দের বিন্যাস বুঝতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এম্পিরিক্যাল অ্যাস্থেটিকসের স্নায়ুবিজ্ঞানী ও সাবেক পেশাদার ব্যালে নৃত্যশিল্পী জুলিয়া এফ ক্রিস্টেনসেনের মতে, নাচের মধ্যে এমন তিনটি বিষয় একসঙ্গে পাওয়া যায়, যা অন্য অনেক কর্মকাণ্ডে একত্রে পাওয়া যায় না। এগুলো হলো-শারীরিক ব্যায়াম, সামাজিক যোগাযোগ এবং সংগীতের তালে সৃজনশীলভাবে নিজেকে প্রকাশের আনন্দ।
নাচের সময় শরীর থেকে এন্ডোরফিন নামের হরমোন নিঃসৃত হয়। এটি ভালো অনুভূতি তৈরি করে, বিষণ্নতা কমাতে সহায়তা করে এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করে।
বাড়ে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা: নাচ শুধু শরীরের ব্যায়াম নয়, এটি মস্তিষ্কেরও এক ধরনের অনুশীলন। নাচের সময় ছন্দ, নির্দিষ্ট ভঙ্গি ও ধাপ মনে রাখতে হয়। এতে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং চিন্তার গতি বাড়তে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নাচ তাৎক্ষণিকভাবে মন ভালো করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে ভূমিকা রাখে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
শিশুদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র পাঁচ মিনিটের ছন্দোবদ্ধ দলীয় নাচের পর গণিতের কাজে তাদের মনোযোগ বেড়েছে।
বাড়ে সৃজনশীলতা: মাত্র পাঁচ মিনিটের নাচও সৃজনশীল চিন্তার বিকাশে সহায়তা করতে পারে। মনোবিজ্ঞানের ‘সুপ্তচিন্তন প্রক্রিয়া’ বা ইনকিউবেশন ইফেক্ট নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো জটিল সমস্যার সমাধান থেকে সাময়িক বিরতি নিলে অবচেতন মন সেই সমস্যা নিয়ে কাজ করতে থাকে। পরে হঠাৎ করেই নতুন ও সৃজনশীল সমাধান পাওয়া যেতে পারে।
নাচের সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ সক্রিয় হয়, যা নতুন চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। বিশেষ করে স্বতঃস্ফূর্ত নাচ মানুষের বহুমুখী চিন্তার বিকাশে ভূমিকা রাখে।
উন্নত হয় ভারসাম্য: নাচ শরীরের ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ায়। এ কারণে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায়ও অনেক সময় নাচভিত্তিক থেরাপি ব্যবহার করা হয়।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ ১৮ মাস নাচের অনুশীলনের ফলে মানুষের শারীরিক ভারসাম্যের উন্নতি হয়েছে এবং মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশের আকারও বেড়েছে। হিপোক্যাম্পাস স্মৃতি, শেখার ক্ষমতা ও দিকনির্ণয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
শুরুতে নাচতে কিছুটা সংকোচ বা অস্বস্তি লাগতে পারে। তবে নিয়মিত চর্চায় এটি আনন্দদায়ক অভ্যাসে পরিণত হয়। আর সেই সঙ্গে পাওয়া যায় শরীর, মন ও মস্তিষ্কের নানা উপকার। সূত্র: বিবিসি
সানা/আপ্র/৩১/৭/২০২৬