প্রিয়জন হারানোর শোক মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। এই কষ্টের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না। সময়ের নিয়মে অনেকেই ধীরে ধীরে এই শোক সামলে নেন, ফিরে আসেন স্বাভাবিক জীবনে। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে তা ঘটে না। কিছু মানুষ আছেন, যাদের জন্য শোক কোনো একসময় থেমে যায় না—বরং সময়ের সঙ্গে আরও গভীর, আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ‘প্রোলংড গ্রিফ ডিজঅর্ডার’ বা সংক্ষেপে ‘পিজিডি’। এটি কোনো দুর্বলতা নয়, কোনো ইচ্ছাশক্তির অভাবও নয়। বরং গবেষণা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মস্তিষ্কই যেন তাকে আটকে রাখে সেই হারানোর স্মৃতির ভেতর, এক অদৃশ্য কারাগারে।
শোক থেকে রোগ—বিতর্কের শুরু
২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা পিজিডিকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি মানসিক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বিতর্ক। প্রিয়জন হারালে কষ্ট পাওয়া তো স্বাভাবিক—তাহলে সেটিকে রোগ বলা হবে কেন? শোক কাটিয়ে ওঠার কি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীরা এগিয়ে আসেন। তারা সাধারণ শোকগ্রস্ত মানুষ এবং পিজিডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের কার্যক্রম তুলনা করে দেখেন। ফলাফল ছিল বিস্ময়কর—দুটি অবস্থার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট এবং বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত।
মস্তিষ্কে শোকের অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের গবেষক রিচার্ড ব্রায়ান্ট এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালনা করেন। তিনি পিজিডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপের সঙ্গে বিষণ্নতা ও ট্রমা (পিটিএসডি) আক্রান্ত মানুষের মস্তিষ্কের তুলনা করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, পিজিডি রোগীদের মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেমে’ বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। মস্তিষ্কের একটি অংশ—নিউক্লিয়াস অ্যাকামবেন্স—যা সাধারণত আনন্দ, প্রাপ্তি বা অনুপ্রেরণার সঙ্গে যুক্ত, সেটি অস্বাভাবিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। মৃত প্রিয়জনের ছবি বা স্মৃতির সংস্পর্শে এলে এই অংশ অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, জীবনের অন্য কোনো আনন্দদায়ক বিষয় তাদের আর তেমনভাবে নাড়া দেয় না। ফলে তারা ধীরে ধীরে আটকে পড়েন এক নির্দিষ্ট স্মৃতির ভেতর—যেখানে কেবলই প্রিয়জনের অনুপস্থিতির হাহাকার।
আবেগ ও স্মৃতির ভাঙন
মস্তিষ্কের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ—অ্যামিগডালা ও ডান হিপোক্যাম্পাস—আমাদের আবেগ ও স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, পিজিডি আক্রান্ত ব্যক্তিদের সামনে মৃত্যু বা কবরস্থানসংক্রান্ত ছবি উপস্থাপন করলে এই অংশগুলো তীব্রভাবে সক্রিয় হয়।
কিন্তু যখন তাদের সামনে সুন্দর প্রকৃতি বা ইতিবাচক দৃশ্য দেখানো হয়, তখন এই অংশগুলো প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, তাদের মস্তিষ্ক ইতিবাচক অনুভূতি গ্রহণ করার ক্ষমতা অনেকটাই হারিয়ে ফেলে। আবেগের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
পিটিএসডি থেকে ভিন্নতা
পিজিডি এবং পিটিএসডির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। পিটিএসডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত কষ্টদায়ক স্মৃতি এড়িয়ে চলতে চান। কিন্তু পিজিডির ক্ষেত্রে ঘটে উল্টোটা।
এরা প্রিয়জনের স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে রাখেন। মৃত ব্যক্তির ব্যবহার করা জিনিস, স্মৃতি, মুহূর্ত—সবকিছুর প্রতি এক ধরনের গভীর টান অনুভব করেন। তারা যেন ইচ্ছে করেই ডুবে থাকতে চান সেই অতীতের জগতে।
আগে থেকে কি বোঝা সম্ভব?
এই রোগ নির্ণয় করা সহজ নয়। নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক ক্যাথরিন শিয়ার জানিয়েছেন, শুধু একবার মস্তিষ্ক স্ক্যান করেই এই জটিল অবস্থা পুরোপুরি বোঝা যায় না।
তবে কিছু ক্ষেত্রে আগাম ইঙ্গিত পাওয়া সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালার সংযোগে অস্বাভাবিকতা থাকে, তারা ভবিষ্যতে আরও তীব্র শোকে আক্রান্ত হতে পারেন। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট প্যাটার্ন দেখে আগে থেকেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে।
চিকিৎসার ভিন্ন পথ
পিজিডির চিকিৎসা সাধারণ বিষণ্নতার মতো নয়। প্রচলিত অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ অনেক সময় এতে কার্যকর হয় না। বরং প্রয়োজন হয় বিশেষ ধরনের শোক-পরিচর্যা থেরাপি, যা ধীরে ধীরে মানুষকে স্মৃতির ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে।
এই কারণেই সাধারণ শোক এবং পিজিডির মধ্যে পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল নির্ণয় হলে চিকিৎসাও ভুল পথে চলে যেতে পারে।
শেষকথা
প্রিয়জন হারানোর শোক কখনোই পুরোপুরি মুছে যায় না—তবে অধিকাংশ মানুষই তা নিয়ে বাঁচতে শেখেন। কিন্তু কিছু মানুষ সত্যিই আটকে যান সেই শোকের অতল গহ্বরে।
তাদের বিচার না করে, দুর্বল না ভেবে, বোঝার চেষ্টা করাই জরুরি। কারণ অনেক সময়, তাদের লড়াইটা কেবল মনে নয়—মস্তিষ্কের গভীর গঠনেই গেঁথে থাকে।
সানা/আপ্র/২৮/৪/২০২৬