শিশু মানেই হাসি, খেলাধুলা আর দুরন্তপনা—এমনটাই মনে করেন অনেকেই। তাই ছোটদের মনেও যে দুশ্চিন্তা, ভয় কিংবা মানসিক চাপ জমতে পারে, তা অনেক অভিভাবকের ধারণার বাইরে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও নানা ধরনের উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতার শিকার হয়। পার্থক্য শুধু এটুকু, শিশুরা মনের ভেতরের চাপ সব সময় মুখে প্রকাশ করতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো মানসিক সমস্যা তৈরি হলে শিশু নিজে থেকেই এসে সব কথা খুলে বলবে—এমনটা আশা করা ঠিক নয়। বিশেষ করে ছোট শিশুদের আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশের মতো যথেষ্ট পরিপক্বতা থাকে না। ফলে তারা বিভিন্ন আচরণের মাধ্যমে মনের অস্বস্তি প্রকাশ করে। অনেক সময় অভিভাবকেরা এসব লক্ষণকে দুষ্টুমি, জেদ কিংবা বয়সসুলভ সাময়িক আচরণ ভেবে এড়িয়ে যান।
শিশুর মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা সব সময় সরাসরি বোঝা যায় না। তবে তাদের আচরণে কিছু পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খেয়াল করা প্রয়োজন।
শারীরিক অসুস্থতার অভিযোগ
কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই স্কুলে যাওয়ার কথা উঠলে শিশুর পেটে ব্যথা শুরু হতে পারে। আবার ছুটির দিন শেষে স্কুলে যাওয়ার আগের রাতে মাথাব্যথার অভিযোগও করতে পারে। অনেক সময় মানসিক চাপ শিশুদের মধ্যে প্রথমে শারীরিক অস্বস্তি বা ব্যথা হিসেবে প্রকাশ পায়। তারা মনের ভেতরের অস্থিরতা বুঝতে না পেরে শুধু ব্যথার কথাই জানায়।
মেজাজ ও আচরণে পরিবর্তন
আগে যে শিশু একা খেলতে ভালোবাসত, সে হঠাৎ বাবা-মাকে ছেড়ে থাকতে চাইছে না। রাতে একা ঘুমাতে ভয় পাচ্ছে, সামান্য বিষয়েই কেঁদে ফেলছে কিংবা অল্পতেই রেগে যাচ্ছে। আবার কোনো শিশু আগের মতো বন্ধুদের সঙ্গে মিশছে না, খেলাধুলায় আগ্রহ হারাচ্ছে কিংবা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে।
এ ছাড়া ঘুমের অনিয়ম, খিটখিটে মেজাজ, ক্ষুধার পরিবর্তন, মনোযোগের অভাব এবং আগের তুলনায় অতিরিক্ত চুপচাপ হয়ে যাওয়াও মানসিক অস্বস্তির ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে এসব পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হলে অভিভাবকদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও ব্যস্ততা
শিশুর মানসিক চাপের অন্যতম কারণ হতে পারে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত প্রত্যাশা। ভালো ফলাফলের চাপ, নিয়মিত কোচিং, একের পর এক পরীক্ষা, নানা ধরনের ক্লাস এবং ব্যস্ত রুটিনের মধ্যে অনেক শিশুই নিজের মতো করে সময় কাটানোর সুযোগ পায় না।
এ ছাড়া স্কুলে সহপাঠীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, বুলিং, বন্ধুত্বের সমস্যা, পারিবারিক অশান্তি কিংবা বড়দের অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাও শিশুর মনে প্রভাব ফেলতে পারে। ডিজিটাল পর্দার অতিরিক্ত ব্যবহার ঘুম, দৈনন্দিন রুটিন ও মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সন্তানকে মানসিকভাবে সুরক্ষিত রাখবেন যেভাবে
শিশুর মানসিক চাপ কমাতে এবং তাকে সুস্থ রাখতে পরিবারের সদস্য ও অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে কিছু বিষয় অনুসরণ করা যেতে পারে।
শিশুর মন খারাপের কারণ জানতে গিয়ে সরাসরি জোরাজুরি না করে তাকে নিজের অনুভূতি সহজ ভাষায় প্রকাশ করতে উৎসাহিত করুন। তাকে বোঝান, ভয় পাওয়া বা মন খারাপ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রতিদিনের জীবনযাপনে একটি সুশৃঙ্খল রুটিন বজায় রাখতে সহায়তা করুন।
মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্রের ব্যবহার সীমিত করে বই পড়া, ছবি আঁকা, বাইরে খেলাধুলা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন। শিশু বারবার প্রশ্ন করলে বা সামান্য কারণে বিরক্ত হলে ধৈর্য ধরে তার কথা শুনুন। তার অনুভূতিকে অবহেলা না করে বোঝার চেষ্টা করুন।
কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন?
শিশুর আচরণে সাময়িক পরিবর্তন দেখা গেলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বড় কোনো পরিবর্তন, নতুন পরিবেশ কিংবা কঠিন অভিজ্ঞতার পর শিশু কিছুদিন অস্বস্তিতে থাকতে পারে। তবে উদ্বেগ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে, ক্রমশ বাড়লে কিংবা পড়াশোনা, ঘুম, খাওয়া, খেলাধুলা ও সামাজিক সম্পর্ক ব্যাহত করলে শিশু বিশেষজ্ঞ অথবা শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শিশু যদি নিজেকে আঘাত করার কথা বলে, আত্মহানির ইঙ্গিত দেয় কিংবা নিজের বা অন্যের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করে, তাহলে দ্রুত পেশাদার সহায়তা নিতে হবে।
সন্তানের শুধু পড়াশোনা, ফলাফল কিংবা দৈনন্দিন কাজের খোঁজ রাখলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার মনের খবর নেওয়া, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় পাশে থাকাও অভিভাবকত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এসি/আপ্র/০৭/১১/২০২৬