ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিটের প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়লেও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি মানছে না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা মন্ত্রীর পদত্যাগ বা অপসারণ ছাড়া রাজপথের কর্মসূচি প্রত্যাহার না করার ঘোষণা দিয়েছে।
নিট পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) অভিযোগ করছে, প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষায় অনিয়মের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে দায়িত্ব নিতে হবে। তবে সরকার বলছে, সমস্যার সমাধান হবে সংস্কারের মাধ্যমে, পদত্যাগের মাধ্যমে নয়।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের কোনো সম্ভাবনা নেই এবং সরকার তার পাশে রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাতীয় পরীক্ষা সংস্থার (এনটিএ) কার্যক্রমে থাকা ত্রুটি ও দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার।
সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, পদত্যাগ নেওয়া সহজ সিদ্ধান্ত হলেও জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট অনুযায়ী সরকার দায়িত্ব পালন করবে। একই সঙ্গে পরীক্ষাব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ, ছররা গুলির অভিযোগ: এদিকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ২০ জুলাই পার্লামেন্ট অভিমুখে বিক্ষোভের সময় পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে এবং কয়েকজনের ওপর ছররা গুলি ব্যবহার করা হয়।
দিল্লির একটি সরকারি হাসপাতালের নথিতে এক বিক্ষোভকারীর শরীরে ছররা গুলির আঘাতের উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ বছর বয়সি ওই ব্যক্তির ডান কনুই ও পিঠে ছররার টুকরো পাওয়া যায়। তবে দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর ছররা গুলি ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পুলিশের দাবি, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে ছররা গুলি ব্যবহারের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা বলছে, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পদক্ষেপে বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
বিক্ষোভে আহতদের মধ্যে সাহিল লোচাব নামে এক তরুণের ডান চোখে ছররা গুলির আঘাতের অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। আরো একাধিক আহত বিক্ষোভকারী চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
সংসদে কঠোর আইনের আশ্বাস মোদির: এর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধে কঠোর বিধানসংবলিত আইন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার বলছে, ভবিষ্যতে পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সংস্কার করা হবে।
তবে বিরোধী দল কংগ্রেস সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করেছে। দলটির নেতারা অভিযোগ করেছেন, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের যথাযথ সমাধান না করে সরকার দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী এক নিবন্ধে আন্দোলন দমনে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে একে কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
২৬ দিনের অনশন ভেঙেছেন ওয়াংচুক: এদিকে নিট ইস্যুতে আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত মুখ পরিবেশ ও সামাজিক আন্দোলনকর্মী সোনাম ওয়াংচুক ২৬ দিনের অনশন শেষ করেছেন। সরকারের আশ্বাসের পর তিনি অনশন ভাঙেন।
২৮ জুন থেকে শুরু করা অনশন শেষ করার সময় ওয়াংচুকের পাশে ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংসহ কয়েকজন নেতা এবং চিকিৎসকরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, তাকে পানি পান করিয়ে অনশন ভাঙতে সহায়তা করা হচ্ছে।
অনশন শেষে ওয়াংচুক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদিও তাকে চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে ওয়াংচুকের অনশন শেষ হলেও আন্দোলন থামছে না বলে জানিয়েছে সিজেপি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যন্তর মন্তরের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।
নিট বিতর্ক এখন শুধু একটি পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ভারতের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, সরকারি জবাবদিহি এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে। সূত্র: এনডিটিভি, রয়টার্স, এপি
সানা/আপ্র/২৪/৭/২০২৬