বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ খাল ও প্রণালিগুলোকে ঘিরে নতুন করে তীব্র হয়ে উঠছে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইরানসহ বড় শক্তিগুলোর অবস্থান ক্রমেই মুখোমুখি হচ্ছে। পানামা খাল, হরমুজ ও মালাক্কা প্রণালি থেকে শুরু করে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল-সবখানেই বাড়ছে কূটনৈতিক চাপ, সামরিক উপস্থিতি ও উত্তেজনা।
বিশ্ব বাণিজ্যের বড় অংশ এখনও সমুদ্রপথনির্ভর। আর এই বাণিজ্যের সিংহভাগ পরিচালিত হয় কয়েকটি সংকীর্ণ নৌপথ বা ‘চোকপয়েন্ট’ ঘিরে। এসব পথের যেকোনও একটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে জ্বালানি, খাদ্য, প্রযুক্তিপণ্য ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ফেরার পর পানামা খাল নিয়ে তার বক্তব্য নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, খাল ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যায্যভাবে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে এবং ওয়াশিংটনের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি পানামা খাল “ফিরিয়ে নেওয়া” নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি।
এর জবাবে পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো স্পষ্ট ভাষায় জানান, খাল পুরোপুরি পানামার নিয়ন্ত্রণে এবং যুক্তরাষ্ট্রের এমন বক্তব্য দেশটির সার্বভৌমত্বের পরিপন্থি। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরোধের পেছনে মূল উদ্বেগ চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। পানামা খালের প্রবেশমুখে চীনা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বন্দর পরিচালনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও বাড়ছে উত্তেজনা। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান আরো জোরালো করেছে। এমনকি দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী প্রণালীর ভৌগোলিক সীমা আরো বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যার কথাও বলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দাবি, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে। ইতোমধ্যে হরমুজ ঘিরে উত্তেজনার প্রভাবে তেলের দাম বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং বিকল্প রুট ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালিও এখন কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথ দিয়ে চীনের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি হয়। ফলে এই পথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেইজিংয়ের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। চীনের কৌশলগত মহলে দীর্ঘদিন ধরেই “মালাক্কা ডিলেমা” ধারণা আলোচিত।
এই ঝুঁকি কমাতে চীন বিকল্প বন্দর, অবকাঠামো ও বাণিজ্যপথে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নৌ উপস্থিতি জোরদার করায় মালাক্কা প্রণালিও দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
এদিকে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল ঘিরেও বাড়ছে অনিশ্চয়তা। ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর হামলা, পশ্চিমা সামরিক প্রতিক্রিয়া এবং বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণের ঘটনায় বহু কোম্পানি এখন সুয়েজ এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলাচল করছে। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময়-দুটিই বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খাল ও প্রণালি এখন শুধু বাণিজ্যপথ নয়; বরং সামরিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তির প্রতীক। হরমুজ মানে জ্বালানি প্রবাহের নিয়ন্ত্রণ, মালাক্কা এশীয় বাণিজ্যের প্রাণরেখা, পানামা খাল আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগ, আর সুয়েজ ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্যের দ্রুততম পথ।
ফলে এসব অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার মানেই বৈশ্বিক রাজনীতিতে কৌশলগত সুবিধা অর্জন। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব এখন এমন এক নতুন ভূরাজনীতির দিকে যাচ্ছে, যেখানে যুদ্ধের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠছে বাণিজ্যপথ, জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ। আর সেই বাস্তবতায় খাল ও প্রণালিগুলোই ক্রমশ পরিণত হচ্ছে আগামী শক্তি-সংঘাতের অন্যতম প্রধান মঞ্চে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৬/৫/২০২৬