দুই দিনের সফর শেষে চীন ছেড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠকের পরও সফরটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোনো কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক অর্জন আসেনি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বরং তাইওয়ান ইস্যুতে কড়া সতর্কবার্তা, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভিন্ন অবস্থান এবং সীমিত বাণিজ্যিক সমঝোতার মধ্যেই শেষ হয়েছে বহুল আলোচিত এই সফর। প্রায় এক দশকের মধ্যে এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীন সফর করলেন। এর আগে ২০১৭ সালেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে চীন সফর করেছিলেন ট্রাম্প নিজেই। এবার মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কমতে থাকা জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়েই তিনি বেইজিং সফরে যান বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনায় মুগ্ধ ট্রাম্প: চীনা সেনাদের কুচকাওয়াজ, বিলাসবহুল ভোজসভা এবং বেইজিংয়ের ঝোংনানহাই কমপ্লেক্সে বিশেষ আতিথেয়তায় ট্রাম্পকে স্বাগত জানান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বিদেশি অতিথিদের জন্য খুব কমই উন্মুক্ত হওয়া এ ঐতিহাসিক কমপ্লেক্স ঘুরে দেখার সুযোগও পান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। শেষ বৈঠকে ট্রাম্প শি জিনপিংকে উদ্দেশ করে বলেন, “এটি অসাধারণ সফর। এখান থেকে ভালো কিছু বেরিয়ে এসেছে বলে আমি মনে করি।” দুই নেতা বৈঠক শেষে একসঙ্গে নৈশভোজেও অংশ নেন।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে বেইজিংয়ের কড়া বার্তা: সফরের মধ্যেই চীন ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এই সংঘাত কখনোই শুরু হওয়া উচিত ছিল না এবং যুদ্ধ অব্যাহত রাখারও কোনো যৌক্তিকতা নেই। চীন একইসঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এ যুদ্ধ বন্ধে শান্তি উদ্যোগে সহায়তার কথাও জানায়। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান প্রসঙ্গে তার ও শি’র অবস্থান “খুব কাছাকাছি”। তবে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি শি জিনপিং। বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, ইরানকে চুক্তিতে রাজি করাতে চীনের সহায়তা চাইবেন ট্রাম্প। তবে বেইজিংয়ের কাছ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
বোয়িং চুক্তি নিয়েও হতাশা: ট্রাম্প সফর শেষে দাবি করেন, চীন ২০০টি বোয়িং বিমান কিনতে রাজি হয়েছে। যদিও সফরের আগে প্রায় ৫০০ বোয়িং জেট কেনার সম্ভাবনার কথা আলোচনায় ছিল। প্রত্যাশার তুলনায় কম অর্ডারের খবরে বোয়িংয়ের শেয়ারদর প্রায় ৪ শতাংশ কমে যায়। একইসঙ্গে বড় ধরনের বাণিজ্যিক সমঝোতা না হওয়ায় চীনের শেয়ারবাজারেও দরপতন দেখা দেয়। কৃষিপণ্য রফতানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু অগ্রগতির কথা জানানো হলেও বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি। প্রযুক্তিপণ্য, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উন্নত চিপ বিক্রির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য কোনো সমঝোতা হয়নি।
তাইওয়ান ইস্যুতে শি’র সতর্কবার্তা: বৈঠকে তাইওয়ান প্রশ্নে ট্রাম্পকে কড়া বার্তা দেন শি জিনপিং। স্বশাসিত দ্বীপটিকে চীন নিজেদের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে প্রতিরক্ষা সহায়তা দিয়ে আসছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে এবং বৈঠকে দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের জন্য ওয়াশিংটনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
সম্পর্কের স্থিতিশীলতা ধরে রাখার বার্তা: বড় কোনো চুক্তি না হলেও দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ককে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “এই সম্পর্ককে কাজে লাগাতে হবে, কখনোই ভণ্ডুল করা যাবে না।”
ট্রাম্পকে চীনের গোপন বাগান ঘুরিয়ে দেখালেন সি: বাণিজ্য, তাইওয়ান ও ইরান ইস্যুতে আলোচনার পর চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বেইজিংয়ের দেয়ালঘেরা ‘ঝংনানহাই’ চত্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কয়েক শ বছরের পুরোনো গাছগুলো ঘুরিয়ে দেখান। তাদের শীর্ষ সম্মেলনের শেষ কয়েক ঘণ্টায় তাঁরা সেখানে কিছুক্ষণ পায়চারি করেন।
সাবেক এই রাজকীয় বাগান বর্তমানে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি এবং স্টেট কাউন্সিল বা চীনের মন্ত্রিসভার কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চত্বরটি রাজধানীর বিখ্যাত নিদর্শন ‘নিষিদ্ধ নগরী’এবং তিয়েনআনমেন স্কয়ারের পাশেই অবস্থিত। গোপন মাইক্রোফোনে দুই নেতার কথোপকথন রেকর্ড হয়েছে, যেখানে কিছু গাছের বয়স এক হাজার বছর শুনে ট্রাম্পকে বিস্ময় প্রকাশ করতে দেখা যায়।
দোভাষীর মাধ্যমে সি চিন পিং যখন বিশালাকার কিছু গাছের কাণ্ডের দিকে ইশারা করছিলেন, তখন তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনাকে বলি, এই পাশের সব গাছের বয়স ২০০ থেকে ৩০০ বছরের বেশি। আর ওই দিকে এমন কিছু গাছ আছে, যেগুলোর বয়স ৪০০ বছরের বেশি।’
ট্রাম্প উত্তরে বলেন, ‘এগুলো কি এত দিন বাঁচে?’ সি যোগ করেন, ‘অন্যান্য জায়গায় এক হাজার বছরের পুরোনো গাছও রয়েছে।’
চীনের প্রেসিডেন্ট সির কাছে ট্রাম্প জানতে চান, অন্য কোনো দেশের নেতাদের এই চত্বরে অভ্যর্থনা জানানো হয় কি না। উত্তরে সি বলেন, ‘খুবই কম। শুরুতে আমরা এখানে সাধারণত কোনো কূটনৈতিক অনুষ্ঠান করতাম না। কিছু অনুষ্ঠান শুরু করার পরও এটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা। উদাহরণস্বরূপ, পুতিন এখানে এসেছেন।’
এরপর সি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ২৮০ বছরের পুরোনো একটি গাছ স্পর্শ করার আমন্ত্রণ জানান। ট্রাম্প উত্তর দেন, ‘বেশ। আমার এটি ভালো লেগেছে।’ মুহূর্তটি রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতার বিরল এক দৃশ্য তুলে ধরেছে।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে বেইজিংয়ের সামরিক কুচকাওয়াজ দেখতে যাওয়ার সময় গোপন মাইক্রোফোনে চীনের প্রেসিডেন্ট সি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কথোপকথন ধরা পড়েছিল। সেখানে তাঁদের অঙ্গ প্রতিস্থাপন এবং মানুষের ১৫০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে শোনা গিয়েছিল।
সানা/আপ্র/১৫/৫/২০২৬