মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত দ্রুতই বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের ছয় দিনে হামলা ও পাল্টা হামলা ছড়িয়ে পড়েছে ইরান, ইসরায়েল, লেবানন, উপসাগরীয় দেশ ও ইরাকজুড়ে। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত ২০ হাজার নাবিক ও ১৫ হাজার ক্রুজ জাহাজের যাত্রী আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সমুদ্রবিষয়ক সংস্থা (আইএমও)।
যুদ্ধের জেরে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে, যার প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে।
উপসাগরে মানবিক সংকট
আইএমও মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার নাবিক ও ১৫ হাজার ক্রুজ জাহাজের যাত্রী আটকা অবস্থায় রয়েছেন।
গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সমুদ্রপথে জাহাজে হামলার সাতটি ঘটনা রেকর্ড করেছে আইএমও। এতে দুইজন নিহত ও সাতজন আহত হয়েছেন।
ডোমিঙ্গুয়েজ বলেন, ‘এটি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, বড় ধরনের মানবিক সংকটও তৈরি করছে। নিরপরাধ নাবিকদের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ
ইরানের বিপ্লবী রক্ষা বাহিনী (আইআরজিসি) গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রুটে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয় এই সরু জলপথ দিয়ে। ইতিমধ্যে অন্তত ছয়টি জাহাজে হামলা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক বাজারে— অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে; ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান চাইলে ড্রোন বা সমুদ্র মাইন ব্যবহার করে এই রুট মাসের পর মাস অচল করে রাখতে পারে।
ইরানে নিহত বেড়ে ১২৩০
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে ইরানজুড়ে দুই হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।
এতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১২৩০ জনে দাঁড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় প্রায় ২০০ জন নিহত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এদিকে রাজধানী তেহরানে বোমাবর্ষণ আরো তীব্র হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
এক বাসিন্দা রয়টার্সকে বলেন, ‘আজকের পরিস্থিতি গতকালের চেয়েও ভয়াবহ। এটি এখন পুরোপুরি একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।’
হাসপাতালও রক্ষা পাচ্ছে না
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, সংঘাতের মধ্যে ইরানের স্বাস্থ্য অবকাঠামোও হামলার শিকার হচ্ছে। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী— ১৩টি হাসপাতালে হামলা হয়েছে; ৪ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত; ২৫ জন আহত। এছাড়া চারটি অ্যাম্বুলেন্সও হামলার শিকার হয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে এক হাজারের বেশি ড্রোন ও শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
ইরানের দাবি, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০টি মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। বাহরাইন জানিয়েছে, তারা এ পর্যন্ত ৭৫টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১২৩টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। আবু ধাবিতে ধ্বংসাবশেষ পড়ে ছয় বিদেশি নাগরিক আহত হয়েছেন।
লেবাননেও সংঘাতের বিস্তার
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যে লেবাননেও হামলা বাড়িয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি বাহিনী দাবি করেছে, উত্তর লেবাননের ত্রিপোলি শহরে হামাসের কমান্ডার ওয়াসিম আত্তাল্লাহ আলিকে হত্যা করা হয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত চার দিনে ইসরায়েলি হামলায় ৭৭ জন নিহত ও ৫২৭ জন আহত হয়েছেন।
ইসরায়েল ইতোমধ্যে বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলির বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
যুদ্ধ আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংঘাত দ্রুতই আরও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে— ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা ইরানের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিতে পারে; মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো আরও হামলার লক্ষ্য হতে পারে; হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে, ইরানের শাহেদ ড্রোন মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
সারসংক্ষেপ
মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন কেবল ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। লেবানন, উপসাগরীয় অঞ্চল ও সমুদ্রপথে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি দ্রুতই বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের দিকে এগোচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
সানা/আপ্র/৫/৩/২০২৬