চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে ওয়াশিংটনে ছিল নজিরবিহীন জাঁকজমক। বিমানঘাঁটিতে ব্যক্তিগত অভ্যর্থনা, সামরিক ব্যান্ড, গার্ড অব অনার, যুদ্ধবিমানের মহড়া, হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ, নতুন হেলিপ্যাড প্রদর্শন-সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের আবহে উষ্ণতার বার্তা স্পষ্ট। কিন্তু আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনের বিপরীতে বাস্তব কূটনীতির অর্জন এখনো সীমিত। বড় কোনো সমঝোতার বদলে বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি সাময়িকভাবে বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ খোলা রাখাই এ সফরের দৃশ্যমান ফল।
তিন দিনের সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শিকে ঘিরে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার বার্তা দিয়েছেন। বিমানবন্দরে নিজে গিয়ে স্বাগত জানানো, হোয়াইট হাউসের বিভিন্ন স্থাপনা দেখানো এবং তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা প্রকাশ্যে বলা ছিল সেই বার্তার অংশ। শির জন্য সামরিক আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজনও করা হয়। সফরের এই জাঁকজমককে দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক আবহ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
কিন্তু আলোচনার টেবিলে বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রায় এক বছর ধরে চলা বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরো দুই মাস বাড়ানোর বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। এর ফলে নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার পরও কিছুটা স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য চুক্তির বদলে মাত্র দুই মাসের সময় বাড়ানোই বোঝাচ্ছে, মূল বিরোধগুলোর স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি।
বাণিজ্যের বাইরেও দুই দেশের মতপার্থক্য গভীর। তাইওয়ান, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং বিরল মৃত্তিকা খনিজের মতো কৌশলগত বিষয়গুলোতে উভয় পক্ষের স্বার্থ এক নয়। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের অবস্থান অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একই সময়ে তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত অস্ত্র বিক্রির বিষয়টিও চীনের নজরে রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও দুই দেশের লক্ষ্য ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র এ প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ঝুঁকি ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন; অন্যদিকে চীন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণে আগ্রহী। এর আগে দুই দেশের কর্মকর্তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়ে সম্মত হলেও বড় কোনো নীতিগত সমঝোতা হয়নি।
শির বক্তব্যেও এই দ্বৈত বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। তিনি দুই দেশের মধ্যে গভীর ও ধারাবাহিক সংলাপের মাধ্যমে মতপার্থক্য কমানো এবং পারস্পরিক আস্থা বাড়ানোর কথা বলেছেন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের কারণে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে-এমন ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’ ধারণার কথাও উল্লেখ করেছেন। ফলে উষ্ণ কূটনৈতিক ভাষার আড়ালেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাস্তবতা যে রয়ে গেছে, তা স্পষ্ট।
অন্যদিকে ট্রাম্প বৈঠককে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর জোর দিয়েছেন। শির সঙ্গে তাঁর কথাবার্তায় বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বিষয়টি বারবার এসেছে। তবে দুই নেতার কূটনৈতিক ভাষার পার্থক্যও চোখে পড়েছে। ট্রাম্প যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সরাসরি যোগাযোগকে গুরুত্ব দিয়েছেন, শি সেখানে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক, পারস্পরিক স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার কথা বলেছেন।
রাষ্ট্রীয় নৈশভোজেও দুই দেশের বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে। প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের মধ্যে ইলন মাস্ক, টিম কুক, জেনসেন হুয়াং ও স্যাম অল্টম্যানের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। অতিথিদের পরিবেশন করা হয় সামুদ্রিক মাছের বিশেষ পদ, ভ্যানিলোা তিলের আবরণে তৈরি সি-বাস, মিষ্টান্ন ও হোয়াইট হাউসের মধু দিয়ে তৈরি আইসক্রিম। শিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক ঈগলের আদলে তৈরি একটি বিশেষ মূর্তিও উপহার দেন ট্রাম্প।
সব মিলিয়ে শির ওয়াশিংটন সফর দুই দেশের সম্পর্কের উত্তেজনা কমানোর একটি কূটনৈতিক মঞ্চ তৈরি করেছে। বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো সেই মঞ্চকে কিছুটা স্থিতিশীলও করেছে। কিন্তু তাইওয়ান, ইরান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য সম্পর্কের মতো মূল বিরোধগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। ফলে এই সফরের সবচেয়ে দৃশ্যমান অর্জন যদি হয় জাঁকজমক ও সৌহার্দ্যের প্রদর্শন, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রয়ে গেছে - সেই সৌহার্দ্য কতটা বাস্তব নীতিগত সমঝোতায় রূপ নেয়।
রয়টার্সের বিশ্লেষণেও সফরটিতে প্রতীকী অগ্রগতির তুলনায় বাস্তব নীতিগত অগ্রগতি সীমিত থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
সানা/আপ্র/২৫/৯/২০২৬