মহাবিশ্বের এক বিশালাকার তারায় নাটকীয় পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা-যা তারাদের জীবনচক্র সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। সাধারণত একটি তারার বিবর্তন সম্পন্ন হতে সময় লাগে কোটি কোটি বছর। মানুষের আয়ুষ্কালের মধ্যে আমরা কেবল আকস্মিক ও সহিংস ঘটনাই দেখতে পাই, যেমন বিস্ফোরণ বা অগ্ন্যুৎপাত। কিন্তু এবার বিজ্ঞানীরা এমন এক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছেন, যা মহাজাগতিক সময়ের হিসাবে অত্যন্ত দ্রুত।
‘ডব্লিউওএইচ জি ৬৪’ নামের এই দানবীয় তারাটি সূর্যের চেয়ে প্রায় ২৮ গুণ বেশি ভরবিশিষ্ট। এটি আমাদের ছায়াপথ মিল্কি ওয়ে-এর উপগ্রহ ছায়াপথ লার্জ ম্যাজেলানিক ক্লাউড-এ অবস্থিত। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার আলোকবর্ষ। এক আলোকবর্ষ হলো আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে-প্রায় ৯ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।
গত তিন দশকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, তারাটির রঙ ও তাপমাত্রায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটেছে। আগে এটি অতিকায় লাল তারা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, তারাটি ধীরে ধীরে হলুদাভ রূপ ধারণ করছে। অর্থাৎ, এটি লাল অতিদানব অবস্থা থেকে হলুদ অতিদানব পর্যায়ে রূপান্তরিত হয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই পরিবর্তনের পেছনে কোনো বড় বিস্ফোরণ বা অগ্ন্যুৎপাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন এথেন্সের ঘধঃরড়হধষ ঙনংবৎাধঃড়ৎু ড়ভ অঃযবহং-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী গঞ্জালো মুনিওজ সানচেজ। তাঁর ভাষায়, সাধারণত তারার বিবর্তন এত দীর্ঘ সময়জুড়ে ঘটে যে মানুষ কেবল আকস্মিক বিস্ফোরণ বা দুটি তারার মিলনের মতো ঘটনাই প্রত্যক্ষ করতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে একটি তারার দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের প্রত্যক্ষ প্রমাণ মিলছে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ঘধঃঁৎব অংঃৎড়হড়সু-এ। গবেষকদের মতে, প্রচলিত তারার গঠন ও বিবর্তন সম্পর্কিত কোনো মডেলই এখন পর্যন্ত এই নাটকীয় পরিবর্তনকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেনি।
আকার-আয়তনের দিক থেকে তারাটি বিস্ময়কর। সূর্যের তুলনায় এর উজ্জ্বলতা প্রায় তিন লাখ গুণ বেশি। যদি এই তারা আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রে সূর্যের স্থানে অবস্থান করত, তবে এর পৃষ্ঠ বৃহস্পতি ও শনির কক্ষপথের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিস্তৃত হতো। এমনকি আলোর গতিতে চললেও তারাটির একবার চারপাশ প্রদক্ষিণ করতে সময় লাগত প্রায় ছয় ঘণ্টা।
প্রায় এক কোটি বছর বয়সী এই তারাটি বর্তমানে জীবনের শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তুলনায় আমাদের সূর্যের বয়স প্রায় সাড়ে চারশ কোটি বছর এবং এর সামনে আরো প্রায় পাঁচশ কোটি বছরের স্থিতিশীল সময় রয়েছে।
সূর্যের ভরের আট থেকে ২৩ গুণ বড় তারাগুলো সাধারণত লাল অতিদানব পর্যায় অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত সুপারনোভা বিস্ফোরণে বিলীন হয়। তবে ২৩ থেকে ৩০ গুণ ভরবিশিষ্ট তারাগুলোর পরিণতি সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন। তারা কি সুপারনোভা হয়ে বিস্ফোরিত হবে, নাকি সরাসরি সংকুচিত হয়ে কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হবে-এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি।
ডব্লিউওএইচ জি ৬৪-এর ক্ষেত্রে আরেকটি জটিলতা হলো, এটি একটি যুগ্ম তারা ব্যবস্থার অংশ। অর্থাৎ, মহাকর্ষীয় টানে এটি আরেকটি তারার সঙ্গে আবদ্ধ। গবেষকদের ধারণা, সঙ্গী তারাটির সঙ্গে পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও এ নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। ভবিষ্যতে দুটি তারা একে অপরের সঙ্গে মিলেও যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, হয়তো পর্যবেক্ষণ শুরুর আগেই তারাটিতে কোনো বড় অস্থিরতা ঘটেছিল, যার ফলে এটি লাল রূপ ধারণ করেছিল এবং এখন আবার তুলনামূলক স্থিতিশীল হলুদ অবস্থায় ফিরে আসছে। আবার সঙ্গী তারার প্রভাবেও সাময়িকভাবে এ রূপান্তর দেখা যেতে পারে।
যাই হোক, ডব্লিউওএইচ জি ৬৪ এখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। মহাবিশ্বের বৃহত্তম তারাগুলোর জীবনচক্র সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দিতে পারে এই একটিমাত্র তারা। মানবসময়ের বিচারে ক্ষণস্থায়ী হলেও মহাজাগতিক ইতিহাসে এই পরিবর্তন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকতে পারে।
সানা/ডিসি/আপ্র/২০২৬